শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৪:১৯ পিএম, ২০২৬-১০-১৭
রান্নাঘরের চুলা জ্বালাতে গ্যাসের সিলিন্ডার লাগবে, অথচ দোকানে গিয়ে মিলছে না নির্ধারিত দামে। কোথাও সিলিন্ডার নেই, কোথাও পাওয়া গেলেও দাম চাওয়া হচ্ছে দুই হাজার টাকার বেশি। সংসারের আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাওয়া নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এ যেন বাড়তি এক দুশ্চিন্তা। বাজারে এলপিজির সরকারি দাম নির্ধারিত থাকলেও সেই দামে গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ উঠছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। চট্টগ্রামেও একই পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন ক্রেতারা।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ১২ কেজির বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৪ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা থেকে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা কার্যকর হয়। সেপ্টেম্বরে এই দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ২৫২ টাকা। প্রতি কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ভ্যাটসহ ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা।
কিন্তু নির্ধারিত দামের সঙ্গে খুচরা বাজারের বাস্তবতার ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন এলাকার বাজারসংক্রান্ত প্রতিবেদনে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগ এসেছে। সে হিসাবে নির্ধারিত দামের চেয়ে ক্রেতাকে বাড়তি দিতে হচ্ছে ৩৬৩ থেকে ৬৬৩ টাকা। তবে এই দাম সব দোকান বা সারা দেশের বাজারের জন্য এক নয়; স্থান ও সময়ভেদে দামের তারতম্য রয়েছে।
রাজধানীতে দাম বেশি, চট্টগ্রামেও সংকটের অভিযোগ
এলপিজির সরবরাহ ও দাম নিয়ে রাজধানীর বাজারে পাওয়া তথ্য পরিস্থিতির অসংগতিই তুলে ধরে। দ্য ডেইলি স্টার-এর ৫ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে ঢাকার ১০টি খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রের তথ্য উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে আটটি দোকানের বিক্রেতা জানান, তাঁরা ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বরের পর নতুন সিলিন্ডার পাননি। বাকি দুটি দোকানের একটিতে যমুনা ব্র্যান্ডের ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৯০০ টাকায় এবং অন্যটিতে ইউনাইটেড আয় গ্যাস ২ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া যায়।
১৩ অক্টোবরের আরেক প্রতিবেদনে ঢাকার ১০টি দোকানের মধ্যে নয়টিতে সিলিন্ডার পাওয়ার কথা বলা হলেও কোনোটিতেই ২ হাজার ২০০ টাকার নিচে বিক্রির তথ্য পাওয়া যায়নি। শ্যামবাজারের এক বিক্রেতা জানান, তিনি পরিবেশকের কাছ থেকেই একটি সিলিন্ডার ২ হাজার ১৫০ টাকায় কিনেছেন।
চট্টগ্রামেও সিলিন্ডারের সংকট ও বাড়তি দাম নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। ৫ অক্টোবর প্রকাশিত স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, বাকলিয়া, চান্দগাঁও ও লালখান বাজার এলাকায় সরবরাহের ঘাটতির কথা উঠে আসে। নগরের রহাত্তারপুল এলাকার বাসিন্দা মামুনুল ইসলামের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি দুই সপ্তাহ আগে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার ১ হাজার ৭৫০ টাকায় কিনেছিলেন। পরে একই সিলিন্ডার কিনতে তাঁকে ২ হাজার ২০০ টাকা দিতে হয়।
অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে তাঁর খরচ বেড়েছে ৪৫০ টাকা।
চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় সরকারি দামের চেয়ে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তবে এসব অভিযোগকে পুরো নগরের সর্বজনীন মূল্যচিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাজারভেদে প্রকৃত বিক্রয়মূল্য, সরবরাহের অবস্থা এবং পরিবেশকদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতাদের কেনার দাম যাচাই করা জরুরি।
সরবরাহ পর্যাপ্ত, তবু বাজারে ঘাটতি কেন?
এলপিজির বাজারে সংকটের অন্যতম প্রশ্ন হলো—আমদানি পর্যাপ্ত থাকলে খুচরা পর্যায়ে সিলিন্ডারের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে কেন? লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক ১ অক্টোবরের এক বক্তব্যে দাবি করেন, দেশে এলপিজি আমদানির পরিমাণ পর্যাপ্ত। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে আমদানি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এবং আগস্টে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন।
অন্যদিকে, চট্টগ্রামের পরিবেশকদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সরবরাহ কমে যাওয়ার কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ আমদানির পরিমাণ ও খুচরা বাজারে পণ্য পৌঁছানোর মধ্যে কোথাও অসংগতি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আমদানি পর্যাপ্ত থাকার দাবি সত্য হলেও তা দিয়ে খুচরা বাজারে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে সরবরাহের ঘাটতির অভিযোগ উঠলেই কৃত্রিম সংকট প্রমাণিত হয় না।
এ ক্ষেত্রে আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের মজুত, বিক্রয়মূল্য এবং সরবরাহের হিসাব পর্যালোচনা করা দরকার। কোন পর্যায়ে সিলিন্ডার আটকে যাচ্ছে, কেন নির্ধারিত দামে বিক্রি হচ্ছে না এবং বাড়তি দামের পেছনে প্রকৃত ব্যয় কতটা দায়ী—এসব প্রশ্নের উত্তর তথ্যের ভিত্তিতেই বের করতে হবে।
কমিশন বাড়ানোর দাবি, ধর্মঘট প্রত্যাহার
এলপিজি ব্যবসায়ীদের একাংশ পরিবেশক কমিশন বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। তাঁদের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি সিলিন্ডারে কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা করতে হবে অথবা খুচরা বিক্রয়মূল্যের ৭ শতাংশ কমিশন দিতে হবে। ব্যবসায়ীদের দেওয়া ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী, পরিবেশকের গুদামে পরিবহন বাবদ ৫০ টাকা ওঠানো-নামানো ও খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছাতে ৩৫ টাকা এবং শ্রমিকের মজুরি, গুদাম ও অন্যান্য খরচ বাবদ ২৫ টাকা ব্যয় হয়। এর সঙ্গে ৪০ টাকা মুনাফা যোগ করে তাঁরা কমিশন বাড়ানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন।
তবে এসব ব্যয়ের হিসাব ব্যবসায়ীদের নিজস্ব দাবি। প্রকৃত ব্যয়, কমিশন কাঠামো এবং খুচরা বাজারে বাড়তি দামের সঙ্গে এর সম্পর্ক স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
কমিশন বাড়ানোর দাবিতে ব্যবসায়ীরা ১৫ ও ১৬ অক্টোবর দেশব্যাপী ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ১৪ অক্টোবর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং বিইআরসির চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকের পর তাঁরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন। ব্যবসায়ীদের দাবি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে ২৯ অক্টোবর বিইআরসির গণশুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে, সরবরাহ ব্যাহত হলে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫৬ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে। তবে সতর্কবার্তা বা বৈঠকই যথেষ্ট নয়; বাজারে তার বাস্তব প্রতিফলন আছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রামে নজরদারি কতটা কার্যকর?
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন অবৈধ মজুত, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রির বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছে। ৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়ানের বরাত দিয়ে এ উদ্যোগের কথা বলা হয়।
কিন্তু নজরদারির কার্যকারিতা বোঝা যাবে বাজারে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে কি না, অতিরিক্ত দাম নেওয়ার ঘটনায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে কি না—এসবের ভিত্তিতে। শুধু অভিযান পরিচালনা বা সতর্কবার্তা দিয়ে বাজারে স্থায়ী শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। প্রয়োজন নিয়মিত বাজার তদারকি, পরিবেশকদের সরবরাহের হিসাব যাচাই এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা।
বিশেষ করে চট্টগ্রামের মতো বাণিজ্যিক নগরে আমদানি, পরিবহন, গুদামজাতকরণ ও খুচরা বিক্রির প্রতিটি ধাপের তথ্য সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। কোনো পর্যায়ে অস্বাভাবিক মজুত বা মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেলে তার কারণ প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত পরিবহন ব্যয় ও যৌক্তিক ব্যবসায়িক মুনাফার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে, যাতে বাজার নিয়ন্ত্রণের নামে সরবরাহ আরও বাধাগ্রস্ত না হয়।
সরকারি মূল্য আছে, ক্রেতার স্বস্তি কোথায়?
এলপিজির বাজারে অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ উঠলেই কোনো সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। এ জন্য প্রয়োজন প্রমাণ, সরবরাহের তথ্য, মজুতের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের পর্যালোচনা। তবে একই সময়ে একাধিক এলাকায় নির্ধারিত দামে পণ্য না পাওয়া এবং বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ উঠলে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত করা।
একটি ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে বাড়তি কয়েক শ টাকা ব্যয় অনেক পরিবারের মাসিক বাজেটে বড় চাপ তৈরি করে। রান্নার গ্যাস কোনো বিলাসপণ্য নয়; শহরের বহু পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপকরণ। তাই এর দাম ও সরবরাহে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে।
সরকারি মূল্য নির্ধারণের উদ্দেশ্য শুধু একটি অঙ্ক ঘোষণা করা নয়, বরং সেই মূল্যে পণ্য পাওয়ার বাস্তব সুযোগ তৈরি করা। আমদানি পর্যাপ্ত থাকার দাবি, পরিবেশকদের সরবরাহ-সংকটের অভিযোগ, ব্যবসায়ীদের কমিশন বাড়ানোর দাবি এবং ক্রেতাদের বাড়তি দাম দেওয়ার অভিজ্ঞতা—সবকিছু একসঙ্গে যাচাই করেই সমস্যার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করতে হবে।
চট্টগ্রামসহ দেশের বাজারে নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ, কাগজে দাম নির্ধারণ আর বাজারে সেই দামে পণ্য পাওয়া এক বিষয় নয়। শেষ পর্যন্ত সরকারি সিদ্ধান্তের সাফল্য নির্ধারিত হবে ক্রেতার অভিজ্ঞতায়—রান্নাঘরের সিলিন্ডারটি ন্যায্য দামে, প্রয়োজনের সময় পাওয়া যাচ্ছে কি না, তার ওপরই।
আবদুল্লাহ মজুমদার, মফস্বল সম্পাদক।
আমাদের সাহিত্য : : মহসিন আলম মুহিন মামার বাড়ি মধুর হাঁড়ি, এই কথাটি নয় অজানা। আদর-আমোদ কাঁড়ি কাঁড়ি- থাকলে পাশে নানি-না...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : গভীর রাত। ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁই ছুঁই। বাড়ির অন্য ঘরগুলোর আলো একে একে নিভে গেছে। চারপাশে নেমে এস...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : কালির কুহেলি ঘন, অক্ষর আজ অবরুদ্ধ, ফোরাম-চত্বরে ক্লাবের ছায়া—দ্বন্দ্ব বড় দুর্বোধ্য। মসনদের মায়à¦...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : সব কবিতা শব্দ দিয়ে শুরু হয় না; কিছু কবিতা শুরু হয় নীরবতা দিয়ে। কিছু কবিতা ভাষায় নয়, ভাষাহীনতাà...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : জুলাই— কোনো ক্যালেন্ডারের মাস নয়; রাষ্ট্রের বুকের ভেতর জমে থাকা বজ্রের মতো এক দীর্ঘ কম্পন। রা...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : নক্ষত্রেরও পূর্বের যে নিবিড় অন্ধকার, সেখানেই শব্দ খুঁজে পায় তার আদিম অনুরণন। একজন কবি শুধু পঙ্à¦...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited