চট্টগ্রাম   বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬  

শিরোনাম

বাস্তব জীবনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিরূপ প্রভাব

মুহাম্মদ আমির হোছা্ইন ::    |    ০৮:২৪ পিএম, ২০২৬-০৯-২২

বাস্তব জীবনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিরূপ প্রভাব

নদীর ঘাটে সারি সারি নৌকা নেই। পালতোলা নৌকার ভাটিয়ালি গানও এখন আর আগের মতো শোনা যায় না। তীব্র রোদের দুপুরে উদাস হয়ে বাঁশি বাজানোর দৃশ্য হারিয়ে গেছে অনেকটাই। ঘাসফড়িং ধরার আনন্দ, বৃষ্টি শেষে আকাশে রংধনু দেখে ছুটে যাওয়ার উচ্ছ্বাস, কিংবা বিকেল নামলেই মাঠে শিশু-কিশোরদের দুরন্তপনা- এসব যেন ধীরে ধীরে স্মৃতির পাতায় জায়গা করে নিচ্ছে।

কালবৈশাখীর ঝড়ে আম কুড়ানোর আনন্দ, বর্ষার পানিতে ভিজে যাওয়ার উচ্ছ্বাস কিংবা সন্ধ্যার আগে মাঠ থেকে বাড়ি ফেরার তাড়া—একসময় এগুলো ছিল আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ। এখন সেই জীবনের বড় একটি অংশ দখল করে নিয়েছে ডিজিটাল পর্দা।

প্রযুক্তির উৎকর্ষ, বিশ্বায়ন ও ডিজিটালাইজেশন মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি বদলে দিয়েছে মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের ধরন। চিঠির দীর্ঘ অপেক্ষার জায়গা নিয়েছে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, ইনস্টাগ্রাম, লিংকডইনসহ নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে বার্তা, ছবি ও ভিডিও।

এ পরিবর্তন নিঃসন্দেহে মানবসভ্যতার যোগাযোগব্যবস্থায় এক বড় রূপান্তর। দূরত্ব কমেছে, তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ একে অপরের সংস্কৃতি, জীবনযাপন ও চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

মার্শাল ম্যাকলুহানের ‘বিশ্বগ্রাম’ ধারণা যেন ডিজিটাল যুগে নতুন বাস্তবতা পেয়েছে। এখন সহস্র মাইল দূরে থাকা পরিবারের সদস্যের সঙ্গে মুহূর্তেই কথা বলা যায়। বিদেশে থাকা সন্তান ভিডিও কলে মায়ের মুখ দেখতে পারে। ব্যবসায়ী ঘরে বসেই ক্রেতা বা অংশীদারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। শিক্ষার্থী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের জ্ঞান ও শিক্ষাসামগ্রীর নাগাল পাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে তথ্যপ্রবাহে। কোনো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তি মুহূর্তেই ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করতে পারেন। এর ফলে নাগরিক সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটেছে। প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের বাইরেও মানুষ বিভিন্ন ঘটনার তথ্য জানতে পারছে।

কিন্তু এখানেই রয়েছে বড় একটি ঝুঁকি। তথ্যের গতি যত বেড়েছে, তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনও তত বেড়েছে। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিটি তথ্য সত্য নয়। গুজব, ভুল তথ্য, বিভ্রান্তিকর ছবি ও ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে তথ্যপ্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি-দ্রুততা-কখনো কখনো তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাতেও পরিণত হচ্ছে।

ডিজিটাল পর্দায় বন্দি জীবন:
প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি আমাদের কাছাকাছি এনেছে, নাকি বাস্তব জীবনে আমাদের আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে?

একই ঘরে বসে থাকা চারজন মানুষ চারটি আলাদা পর্দায় ব্যস্ত। পরিবারের সদস্যরা পাশাপাশি বসেও একে অপরের সঙ্গে কথা না বলে অনলাইনে অন্য কারও সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। খাবারের টেবিলে কথোপকথনের বদলে মোবাইল ফোন হয়ে উঠছে মনোযোগের কেন্দ্র।

এই পরিবর্তন কেবল যোগাযোগের ধরন বদলাচ্ছে না; বদলে দিচ্ছে আমাদের সামাজিক আচরণও।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার অনেকের মধ্যে একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও পারিবারিক যোগাযোগ কমে যাওয়ার অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। মানুষ বাস্তব জীবনের সম্পর্কের চেয়ে ভার্চ্যুয়াল সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করলে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় মোবাইল, ট্যাব বা কম্পিউটারের পর্দায় কাটালে ঘুম, শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং সরাসরি সামাজিক মেলামেশা কমে যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাজানো-গোছানো জীবন দেখে নিজের জীবনকে তুলনা করার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে আত্মসম্মানবোধের সংকট, দুশ্চিন্তা কিংবা হতাশার সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় আলোচনা হয়েছে।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার একমাত্র কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়। পারিবারিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, শিক্ষা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং অন্যান্য সামাজিক কারণও মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে।

জনপ্রিয় হওয়ার অদৃশ্য প্রতিযোগিতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার প্রতিযোগিতাও নতুন প্রজন্মের ওপর এক ধরনের সামাজিক চাপ তৈরি করেছে। কত লাইক, কত শেয়ার, কত অনুসারী এসব যেন অনেকের কাছে নিজের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে উঠছে।

রাতারাতি পরিচিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় কেউ কেউ অস্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি, অশালীন ভাষা কিংবা বিতর্কিত কনটেন্ট প্রকাশ করছে। ভাষার স্বাভাবিক সৌন্দর্যও অনেক ক্ষেত্রে বিকৃত হচ্ছে। মনোযোগ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় কনটেন্টের মানের চেয়ে চমক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাইবারবুলিং, অনলাইন হয়রানি, সাইবারস্টকিং ও ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার। একজন মানুষ বাস্তব জীবনে যতটা নিরাপদ বোধ করেন, অনলাইনে সবসময় ততটা নিরাপদ থাকেন না।

বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের জন্য ঝুঁকিটি আরও বেশি। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে অনলাইন যোগাযোগ, ভুয়া পরিচয়, প্রতারণা কিংবা ব্যক্তিগত ছবি সংগ্রহ করে হয়রানি এসব ঘটনা বাস্তব জীবনে গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন ঝুঁকি
প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। এর ইতিবাচক ব্যবহার অসংখ্য। কিন্তু অপব্যবহারের সম্ভাবনাও কম নয়।

এআই ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির ছবি বিকৃত করা, ভুয়া ভিডিও তৈরি করা কিংবা বাস্তবে ঘটেনি এমন দৃশ্য তৈরি করা এখন তুলনামূলক সহজ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নারীদের ছবি ব্যবহার করে যৌন হয়রানিমূলক ভুয়া ছবি বা ‘ডিপফেক’ তৈরির ঘটনা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কারণ হয়েছে।

এ ধরনের কনটেন্ট শুধু অনলাইনে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা ভুক্তভোগীর বাস্তব সামাজিক জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, সম্মান ও মানসিক সুস্থতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল নৈতিকতা ও আইনি সচেতনতাও জরুরি হয়ে পড়েছে।

প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে নিষিদ্ধ করা কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। কারণ শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, সাংবাদিকতা, কর্মসংস্থান, বিনোদন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ডিজিটাল যোগাযোগের প্রয়োজন রয়েছে।

প্রয়োজন প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের একটি সুস্থ ভারসাম্য।

শিশু-কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে তাদের খেলাধুলা, বই পড়া, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো এবং পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল সাক্ষরতা, তথ্য যাচাই, সাইবারবুলিং এবং অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে শিক্ষা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

আমাদের মনে রাখতে হবে ভার্চ্যুয়াল বন্ধুত্ব বাস্তব বন্ধুত্বের বিকল্প নয়। ভিডিও কলে দেখা মুখ কখনো কখনো কাছে থাকার অনুভূতি দিতে পারে, কিন্তু প্রিয় মানুষের পাশে বসে কয়েক মিনিট কথা বলার উষ্ণতা আলাদা।

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করার জন্য এসেছে; আমাদের জীবনকে প্রযুক্তির পর্দায় বন্দি করার জন্য নয়।

একদিন নদীর ঘাটে আবার নৌকা ভিড়বে কি না, মাঠে আবার শিশুরা আগের মতো ছুটবে কি না তা হয়তো সময়ই বলবে। কিন্তু আমরা চাইলে অন্তত আমাদের ঘরের দরজাটি ডিজিটাল পর্দার জন্য পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারি।

বৃষ্টির দিনে মোবাইলের পর্দা থেকে চোখ তুলে আকাশের রংধনু দেখা যায়। বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ রেখে মাঠে হাঁটা যায়। পরিবারের সঙ্গে বসে গল্প করা যায়। সন্তানের হাতে শুধু স্মার্টফোন না দিয়ে একটি বই তুলে দেওয়া যায়। 

রিটেলেড নিউজ

উপাচার্য পরিবর্তনের সিন্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল চুয়েট

উপাচার্য পরিবর্তনের সিন্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল চুয়েট

রাউজান প্রতিনিধি : : চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পরিবর্তনের সিন্ধান্তের প্রতিবাদে সাধা...বিস্তারিত


শোক বার্তা

শোক বার্তা

আমাদের ডেস্ক : : আজ সোমবার ২১সেপ্টেম্বর ২০২৬ইং সকাল আনুমানিক ৮  ঘটিকায় আমার শাশুড়ি আম্মা মহান আল্লাহ পাকের ডাক...বিস্তারিত


দৈনিক আমাদের চট্টগ্রামের মফস্বল সম্পাদক আবদুল্লাহ মজুমদার

দৈনিক আমাদের চট্টগ্রামের মফস্বল সম্পাদক আবদুল্লাহ মজুমদার

নিজস্ব প্রতিবেদক : দৈনিক আমাদের চট্টগ্রামের মফস্বল সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন লেখক-সাংবাদিক ও সংগঠক আবদুল্লাহ ...বিস্তারিত


ডেঙ্গু-হাম: কোথায় আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়?

ডেঙ্গু-হাম: কোথায় আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়?

আবদুল্লাহ মজুমদার : : হাসপাতালের করিডোরে স্বজনের উৎকণ্ঠিত মুখ। কারও হাতে জ্বরের রিপোর্ট, কারও কোলে কাঁপতে থাকা শিশু। ক...বিস্তারিত


র‌্যাবের লোগোর নকশা অপরিবর্তিত রেখে ‘এসআরবি’র যাত্রা

র‌্যাবের লোগোর নকশা অপরিবর্তিত রেখে ‘এসআরবি’র যাত্রা

ঢাকা অফিস : : নানামুখী আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত হয়ে ‘স্পেশাল র...বিস্তারিত


সরকারি-বেসরকারি বরাদ্দ আত্মসাতের অভিযোগ, চট্টগ্রামে ভুঁইফোড় এনজিও সংস্থার নামে দৌরাত্ম্য চরমে

সরকারি-বেসরকারি বরাদ্দ আত্মসাতের অভিযোগ, চট্টগ্রামে ভুঁইফোড় এনজিও সংস্থার নামে দৌরাত্ম্য চরমে

স্টাফ রিপোর্টার : : কে. এম. আলী হাসান চট্টগ্রামে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার নামে চলছে নানা অনিয়ম ও লুটপাট—এমন অভিযোগ উঠ...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

নেশনস কাপের ফাইনালে মুখোমুখি সালাহ-মানে

নেশনস কাপের ফাইনালে মুখোমুখি সালাহ-মানে

স্পোর্টস ডেস্ক : : ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের জায়ান্ট লিভারপুলের জার্সিতে খেলেন দুজনেই। আক্রমণভাগে দুজনের রসায়নে অলরেড...বিস্তারিত


মন্ত্রণালয়ের আদেশ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিডিএ-তে শিকড় গেঁড়েছেন হারুন!

মন্ত্রণালয়ের আদেশ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিডিএ-তে শিকড় গেঁড়েছেন হারুন!

নিজস্ব প্রতিবেদক : ​সরকারি আদেশ মানেই যেন মগের মুল্লুক! গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট বদলি আদেশকে তোয়াক্কা ন...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর