শিরোনাম
আ.ন.ম. তাজওয়ার আলম | ০৬:১১ পিএম, ২০২৬-০৬-০৪
দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার এবং জাতীয় রাজস্ব আহরণের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়কারী এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ চলে আসছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কাস্টম হাউসে ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে যায় না। প্রতিটি ধাপে রয়েছে দালালের ছায়া, আর সেই দালালদের মাধ্যমেই চলছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের কথিত ঘুষ বাণিজ্য।
বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, ভুক্তভোগীদের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শতাধিক দালালের শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর হয়ে ঘুষের টাকা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও লেনদেনের দায়িত্ব পালন করেন। ফলে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠানটি কার্যত দালালনির্ভর ব্যবস্থার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে বলে মনে করছেন সেবাগ্রহীতারা।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সিএন্ডএফ প্রতিনিধিদের অভিযোগ, আমদানি পণ্য খালাস, শুল্ক নির্ধারণ, মূল্যায়ন, নথি যাচাই, ফাইল নিষ্পত্তি কিংবা আপত্তি নিষ্পত্তির মতো প্রায় প্রতিটি ধাপেই অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের চাপ থাকে। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় কাজ করতে গেলে দিনের পর দিন ফাইল আটকে রাখা হয়, আর ঘুষের বিনিময়ে দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, কাস্টম হাউসের অনেক সেকশনেই বহিরাগত দালালদের প্রভাব এতটাই বেশি যে সাধারণ মানুষ তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেই মনে করেন। কেউ কম্পিউটার অপারেটর, কেউ অফিস সহকারী, কেউবা কর্মকর্তা পরিচয়ে বিভিন্ন টেবিলে অবাধে যাতায়াত করেন। অথচ তাদের বড় একটি অংশের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই।
অভিযোগ রয়েছে, এসব দালাল শুধু ফাইল অনুসরণই করেন না, বরং কোন ফাইল কোথায় যাবে, কোন কর্মকর্তা কত সময়ের মধ্যে অনুমোদন দেবেন, কোথায় কত টাকা দিতে হবে -এসব বিষয়ও নিয়ন্ত্রণ করেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়ে অর্থ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজও করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কাস্টমস সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি বলেন, "অনেক দালাল বছরের পর বছর ধরে একই সেকশনে কাজ করায় তারা কর্মকর্তাদের চেয়েও বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। নতুন কোনো কর্মকর্তা বদলি হয়ে এলেও বাস্তব কাজের নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় এসব সিন্ডিকেটের হাতেই থাকে।"
অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, কাস্টম হাউসের সেকশন-২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮ ও ৯-এর বিভিন্ন শাখাকে ঘিরে পৃথক পৃথক দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। এসব চক্রের সদস্যরা নথি ও ফোল্ডার নিয়ন্ত্রণ, ফাইল এন্ট্রি, কম্পিউটার অপারেটরের দায়িত্ব পালন, নাস্তা সরবরাহের আড়ালে অর্থ আদায়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামে ঘুষের টাকা সংগ্রহ ও সংরক্ষণসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব দালালের অনেকেই নির্দিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর ‘বিশ্বস্ত লোক’ হিসেবে পরিচিত। ফলে তারা প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, কাস্টম হাউসে অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়মে কাজ করাতে গেলে অযথা জটিলতা সৃষ্টি করা হয়। কোনো নথিতে আপত্তি তোলা, অতিরিক্ত ব্যাখ্যা চাওয়া কিংবা ফাইল আটকে রাখার মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাকে দালালের কাছে যেতে বাধ্য করা হয়। এরপর দালালের মাধ্যমে সমাধানের নামে শুরু হয় দর-কষাকষি।
অভিযোগ রয়েছে, এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ফাইল স্থানান্তর, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, আপিল নিষ্পত্তি, ছাড়পত্র প্রদান কিংবা জরিমানার পরিমাণ কমানোর ক্ষেত্রেও অনৈতিক অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে।
একাধিক ব্যবসায়ী জানান, "অনেক সময় সরকারি ফি পরিশোধের পরও আলাদা করে অনানুষ্ঠানিক খরচ বহন করতে হয়। তা না হলে দিনের পর দিন ফাইল আটকে থাকে।"
কাস্টমস সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দাবি, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়। যদিও এ বিষয়ে কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই, তবে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে আসছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরাসরি অর্থ গ্রহণের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে দালালদের নিরাপদ বাহক বা 'ক্যাশিয়ার' হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর ফলে অভিযোগ উঠলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দালাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বহুবার লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি। গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর কাস্টম হাউসের কমিশনারের কাছে একাধিক ব্যক্তি যৌথভাবে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগে বিভিন্ন সেকশনে সক্রিয় দালালদের নাম, তাদের কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজশের বিষয় তুলে ধরা হয়।
তবে অভিযোগকারীদের দাবি, কিছুদিন তৎপরতা কমলেও পরে আবারও একই চিত্র ফিরে আসে। ফলে সিন্ডিকেট ভাঙার উদ্যোগ বাস্তবে ফলপ্রসূ হয়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে অভিযান চালিয়েছে। একাধিক অভিযানে ঘুষের টাকা লেনদেনের সময় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সহযোগীদের আটক করার ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, বিচ্ছিন্ন অভিযানে কয়েকজন ধরা পড়লেও মূল সিন্ডিকেট অক্ষত থেকে যাচ্ছে।
তাদের মতে, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের অভিযান দীর্ঘমেয়াদে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে না।
তালিকাভুক্ত কয়েকজন দালাল গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া বক্তব্যে দাবি করেছেন, কাস্টম হাউসের কাজের বাস্তবতা সম্পর্কে তারাই বেশি জানেন। কেউ কেউ এমনও বলেছেন যে, তারা না থাকলে কাস্টম হাউসের কার্যক্রম ব্যাহত হবে।
একজন বলেন, "আমরা না থাকলে অফিসের কাজকর্ম স্বাভাবিকভাবে চলবে না। অনেক কর্মকর্তা নিয়ম-কানুন বুঝতে আমাদের সহযোগিতা নেন।"
আরেকজনের ভাষ্য, "ঘুষ-দুর্নীতির বিষয়টি সবারই জানা। এখানে বহু বছর ধরে একইভাবে চলছে।"
অভিযোগ রয়েছে, কাস্টম হাউসকে ঘিরে সক্রিয় কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালাল অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাদের অনেকের নামে বা স্বজনদের নামে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি ও বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি, তবে অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্টদের সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা হলে অনেক অনিয়ম বেরিয়ে আসবে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করেছেন, অতীতের তুলনায় দালালদের তৎপরতা কমেছে এবং পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভালো।
তাদের মতে, কাস্টম হাউসে যাতায়াতকারী ব্যক্তিদের বিষয়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নজরদারি রয়েছে এবং কোনো অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তবে ঘুষ বাণিজ্য, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কিংবা দালালদের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের বিষয়ে তারা স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
ব্যবসায়ী, সিএন্ডএফ এজেন্ট ও সেবাগ্রহীতাদের দাবি, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে কাস্টম হাউসের প্রতিটি সেবা সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন, দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
তাদের ভাষায়, "চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস যদি সত্যিকার অর্থে দুর্নীতি ও দালালমুক্ত করা যায়, তাহলে দেশের রাজস্ব খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।"
আবদুল্লাহ মজুমদার : : চট্টগ্রাম নগরীর রাস্তায় প্রতিদিনের যানজট, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, বর্জ্যের স্তূপ আর নাগরিক দুর্ভোগের ম...বিস্তারিত
রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি : : রাঙামাটিতে কোতয়ালী থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে মাদক কারবারি, মাদকসেবী, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযà...বিস্তারিত
মো.আরফান উদ্দীন : পৃথিবীর আর কোন দেশে বাংলাদেশের মতো প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় এত মানুষের প্রাণহানি ঘটে কি না, তা আমার...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : একটি মৃত্যুদণ্ডের খবর কখনো কখনো একটি পরিবারের শোকের সীমানা ছাড়িয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধকেই কাঠগà§...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল, জেলা ৩১৫-বি৪, বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগং কর্ণফুলী এল...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : কবিতা, সাহিত্য এবং আন্তর্জাতিক সাহিত্য বিনিময়ে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানজনক সার্...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited