শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৯:১৯ পিএম, ২০২৬-০৯-০৭
গভীর রাত। ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁই ছুঁই। বাড়ির অন্য ঘরগুলোর আলো একে একে নিভে গেছে। চারপাশে নেমে এসেছে নরম নীরবতা। সারাদিনের ব্যস্ততা আর ছোটাছুটির পর লাবিবা ও লামিসা ঘুমিয়ে পড়েছে। ইকরা আর মুহম্মদেরও মায়ের পাশে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে থাকার কথা।
কিন্তু ঘুমেরও তো সব সময় নিজের ইচ্ছা চলে না।
মনি ওষুধের পাতাটি হাতে নিতেই বিছানার দুই প্রান্ত থেকে দুটি ছোট্ট শরীর হঠাৎ উঠে বসল।
—আমি মাকে ওষুধ খাওয়াব!
ইকরার কণ্ঠে ঘুমজড়ানো স্বরের সঙ্গে মিশে গেল একরাশ অধিকার।
মুহূর্তেই মুহম্মদ প্রতিবাদ করল—
—না, আমি খাওয়াব!
—আমি আগে বলেছি।
—আমি আগে উঠেছি।
—আমি আগে দেখেছি।
—আমি আগে এসেছি।
দুজনের তর্কে ঘরের নীরবতা ভেঙে গেল।
মনি মৃদু হেসে দুজনের দিকে তাকালেন।
—তোমরা দুজনেই খাওয়াবে।
দুজনই থেমে গেল।
মুহম্মদ কিছুক্ষণ মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—দুজন একসঙ্গে কীভাবে?
ইকরা যেন এই সমস্যার সমাধান আগেই ভেবে রেখেছে।
—আমি পানি দেব। তুমি ওষুধ দাও।
মুহম্মদ মাথা নেড়ে রাজি হয়ে গেল।
ইকরা দৌড়ে গেল গ্লাস আনতে। মুহম্মদ দুই আঙুলে ওষুধটি তুলে মায়ের সামনে ধরল।
—মা, মুখ খোলো।
মনি মুখ খুললেন।
ছোট্ট হাত থেকে ওষুধটি মায়ের মুখে গেল। ইকরা পানি এগিয়ে দিল।
—আস্তে খাও, মা।
মনি পানি খেলেন।
দুই শিশুর মুখে তখন এমন এক আনন্দ—যেন তারা এইমাত্র পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ শেষ করেছে।
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আবদুল্লাহ নীরবে দৃশ্যটি দেখছিলেন।
কিছু বললেন না।
শুধু ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল।
তারপর ধীরে ধীরে সরে গেলেন।
হয়তো এই ছোট্ট দৃশ্যটিই একটি গল্পের জন্য যথেষ্ট।
হয়তো এই বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো এমনই—যেগুলো কোনো আয়োজন ছাড়াই প্রতিদিন তৈরি হয়, আবার নিঃশব্দে রাতের অন্ধকারে ঘুমিয়ে পড়ে।
আবদুল্লাহর সংসারে চার সন্তান—লাবিবা, লামিসা, ইকরা ও মুহম্মদ।
চারজন চার রকম।
লাবিবা আঠারো বছরের। সদ্য এসএসসি পাস করেছে। শান্ত স্বভাবের মেয়ে। বেশি কথা বলে না। নিজের কাজ নিজেই করে। বাবার সঙ্গে তার সম্পর্কটাও যেন কথার চেয়ে বোঝাপড়ার।
বাবা ঘরে ঢুকে ক্লান্ত হয়ে বসলে লাবিবা অনেক সময় কিছু না বলেই এক গ্লাস লেবুর শরবত এনে পাশে রাখে।
বাবা কিছু জিজ্ঞেস করেন না।
মেয়েও কিছু বলে না।
তবু দুজনেই বুঝে নেয়—কে কাকে কতটা ভালোবাসে।
লামিসা চৌদ্দ বছরের। জুলেখা আমিনুর রহমান সিটি করপোরেশন উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। বুদ্ধিমতী। ছোটদের ঝগড়া থামানোর দায়িত্বটা সে যেন নিজের ওপরই নিয়েছে।
ইকরা সাত বছরের। হযরত শাহ আমানত ইনস্টিটিউটে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। মুরগির মাংস, ডিম আর ডালের সঙ্গে তার গভীর বন্ধুত্ব।
আর মুহম্মদ?
তার বয়স পাঁচ।
গায়েবি ধন মডেল মাদ্রাসায় পড়ে। ভালো-মন্দ প্রায় সবই খায়। তবে কলা আর ফল দেখলে তার মুখে যে আনন্দ ফুটে ওঠে, তা অন্য কোনো খাবারে দেখা যায় না।
দুষ্টুমির তালিকাতেও সে সবার আগে।
তাই বকুনিটাও বেশি খায়।
কোনো কিছু পড়ে গেলে—
—মুহম্মদ, তুমি ধরেছিলে?
চুপ।
—সত্যি করে বলো।
আরও চুপ।
তারপর খুব আস্তে—
—আমি শুধু ধরেছিলাম।
—তারপর?
—হাত থেকে পড়ে গেছে।
বাবা রাগী চোখে তাকিয়ে থাকেন।
কিন্তু মুহম্মদের সেই নিষ্পাপ মুখ দেখে বেশিক্ষণ কঠোর থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না।
আবদুল্লাহর দিন শুরু হয় ঘরের বাইরে, শেষ হয় অনেক রাতে।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি বের হন। খাতুনগঞ্জে কমার্শিয়াল কাজ থাকে দুপুর পর্যন্ত। এরপর কখনো ব্যক্তিগত কাজ, কখনো মাঠের কাজ। সন্ধ্যা নামলে পত্রিকা অফিস।
লেখালেখি তাঁর নেশা, পেশারও একটি অংশ।
দিনের কাজ শেষ হলেও তাঁর কাজ শেষ হয় না।
পত্রিকা পড়তে হয়। লিখতে হয়। খবরের খোঁজ নিতে হয়। কখনো রাত গভীর হয়ে যায়। বাড়ি ফিরেও লেখার টেবিলে বসতে হয়।
তাই সন্তানদের সঙ্গে তাঁর সময় অল্প।
কিন্তু বাবার জন্য অপেক্ষা করতে তাদের কখনো ক্লান্তি আসে না।
রাত যতই হোক, দরজার বাইরে চাবির শব্দ হলেই ইকরা ছুটে আসে।
মুহম্মদ তো দরজা খোলার আগেই বলে ওঠে,
—আব্বু এসেছে!
কীভাবে সে বুঝতে পারে, কেউ জানে না।
হয়তো বাবার পায়ের শব্দের সঙ্গে তার ছোট্ট হৃদয়ের আলাদা কোনো পরিচয় আছে।
এই বাড়িতে টেলিভিশন নেই।
তাই বাবা বাড়ি ফিরলেই তাঁর মোবাইলের কদর বেড়ে যায় কয়েক গুণ।
—আব্বু, মোবাইল দাও।
—আমাকে আগে দাও।
—না, আমি আগে নেব।
আবদুল্লাহ কখনো মজা করে বলেন,
—তোমরা আমাকে ভালোবাসো, নাকি আমার মোবাইলকে?
মুহম্মদ উত্তর দিতে একটুও দেরি করে না।
—মোবাইলকে।
ঘর হেসে ওঠে।
ল্যাপটপও আছে। তবে সেটি চলে বাবার মোবাইলের এমবিতে।
বাবা বাইরে থাকলে ল্যাপটপও যেন চুপ করে থাকে।
খাবারের টেবিলেও গল্প আছে।
একদিন মুরগির মাংস রান্না হয়েছে।
ইকরা নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে টুকরো গুনছে।
মুহম্মদ পাশ থেকে উঁকি দিল।
—তোমার তিনটা।
—হুম।
—আমার দুইটা।
—তাহলে?
—একটা দাও।
ইকরা সঙ্গে সঙ্গে প্লেট ঢেকে ফেলল।
—দেব না।
—একটু দাও।
—না।
—একটু।
—না!
মুহম্মদ হাত বাড়াতেই ইকরা চিৎকার করে উঠল,
—মা!
মনি ছুটে এলেন।
—কী হয়েছে?
মুহম্মদ বলল,
—ওর মাংস বেশি।
ইকরা প্রতিবাদ করল,
—আমারটা আমি খাব।
মা দুজনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—মাংস নিয়ে এত ঝগড়া করলে দুজনকেই ডাল দেব।
দুজনই চুপ।
কিছুক্ষণ পর মুহম্মদ খুব গম্ভীর মুখে বলল,
—ডাল খাব। কিন্তু মাংস থাকলে ভালো হয়।
লামিসা মুখ চেপে হাসল।
মাও হাসলেন।
সংসার এমনই।
বড় কোনো ঘটনা নেই।
তবু প্রতিদিন কত গল্প জমে থাকে।
আবদুল্লাহ একটু কঠোর মানুষ।
সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে ছাড় দেন না। নিয়মকানুনের ব্যাপারেও কড়া। ভুল করলে বকেন।
কখনো রাগের আঁচ মায়ের গায়েও লাগে।
তবু এই বাড়ির কেউ তাঁর ভালোবাসা নিয়ে সন্দেহ করে না।
কারণ তারা জানে, বাবার ভালোবাসা সব সময় আদর হয়ে আসে না।
কখনো আসে বকুনি হয়ে।
কখনো আসে প্রশ্ন হয়ে—
‘পড়তে বসেছ?’
কখনো উদ্বেগ হয়ে—
‘এত রাত করে ঘুমাবে কেন?’
আবার কখনো আসে একেবারেই নিঃশব্দে—
ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরে ঘুমন্ত সন্তানের কপালে হাত রেখে।
লাবিবা আর লামিসা একসময় ইকরার মতোই ছোট ছিল।
তখন তাদের জন্যও ছিল বাবার একই রকম ব্যস্ততা, একই রকম চিন্তা, একই রকম যত্ন।
এখন তারা বড় হয়েছে।
নিজেদের অনেক কিছু নিজেরাই সামলায়।
ইকরা আর মুহম্মদ এখনো ছোট।
তাই মায়ের আঁচল, বাবার মোবাইল, এক টুকরো মাংস কিংবা একটি ওষুধ—সবকিছু নিয়েই তাদের আলাদা আগ্রহ।
বিশেষ করে মায়ের ওষুধটা।
প্রতিদিন রাতে একই দৃশ্য।
ওষুধ হাতে নিলেই—
—আমি খাওয়াব!
—না, আমি খাওয়াব!
প্রতিদিন একই ঝগড়া।
প্রতিদিনই আবার একই সমাধান।
একজন পানি দেয়।
আরেকজন ওষুধ দেয়।
তারপর দুজনেই মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
মা ওষুধ খেয়েছেন কি না, সেটা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের দায়িত্ব শেষ হয় না।
সেদিনও তাই হলো।
ওষুধ খাওয়ানোর পর মনি শুয়ে পড়লেন।
ইকরা মায়ের হাত ধরে ঘুমিয়ে পড়ল।
মুহম্মদও মায়ের পাশে গা এলিয়ে দিল।
ঘর নিস্তব্ধ।
আবদুল্লাহ লেখার টেবিলে বসেছেন।
সামনে সাদা কাগজ।
কলম হাতে নিয়েও লিখতে পারছেন না।
চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে সন্ধ্যার দৃশ্যগুলো।
মোবাইলের জন্য ছুটে আসা সন্তান।
মাংসের টুকরো নিয়ে ঝগড়া।
মুহম্মদের দুষ্টুমি।
লামিসার বকা।
লাবিবার নীরব যত্ন।
আর সবশেষে—
‘আমি মাকে ওষুধ খাওয়াব।’
আবদুল্লাহ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
ধীরে ধীরে সন্তানদের ঘরের কাছে গেলেন।
ইকরার হাত মায়ের আঁচলে।
মুহম্মদের হাত মায়ের হাতের ওপর।
তিনি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।
এই চার সন্তান একদিন বড় হয়ে যাবে।
তখন হয়তো কেউ বাবার মোবাইলের জন্য ছুটে আসবে না।
কেউ মাংসের টুকরো গুনবে না।
কেউ মায়ের ওষুধ হাতে নিয়ে বলবে না—
‘আমি খাওয়াব।’
জীবন বড় অদ্ভুত।
যে মুহূর্তগুলো এখন খুব সাধারণ মনে হয়, একদিন সেগুলোই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।
আবদুল্লাহ ফিরে এসে আবার টেবিলে বসলেন।
সাদা কাগজটা সামনে টেনে নিলেন।
কলম ধরলেন।
ঠিক তখন পাশের ঘর থেকে ঘুমজড়ানো কণ্ঠ ভেসে এল—
—মা... কাল কিন্তু আমি খাওয়াব।
আবদুল্লাহর হাত থেমে গেল।
তিনি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলেন।
তারপর কলমটা নামিয়ে রাখলেন।
সেদিন আর কোনো গল্প লেখা হলো না।
কারণ সেদিন তিনি বুঝেছিলেন—
সব গল্প কাগজে লেখা হয় না।
কিছু গল্প মানুষের ঘরে ঘুমিয়ে থাকে।
কিছু গল্প শব্দে ধরা যায় না।
কিছু গল্প শুধু অনুভব করা যায়—একটি শিশুর ছোট্ট হাতে, মায়ের ক্লান্ত মুখের হাসিতে, বাবার নীরব চোখে।
সেই গল্পের কোনো মলাট নেই।
কোনো প্রকাশক নেই।
কোনো পাঠকও নেই।
তবু সেটিই হয়তো মানুষের জীবনের সবচেয়ে সত্য গল্প।
আর সেই গল্পের নাম—ভালোবাসা।
আবদুল্লাহ মজুমদার : : রান্নাঘরের চুলা জ্বালাতে গ্যাসের সিলিন্ডার লাগবে, অথচ দোকানে গিয়ে মিলছে না নির্ধারিত দামে। কোথাও...বিস্তারিত
আমাদের সাহিত্য : : মহসিন আলম মুহিন মামার বাড়ি মধুর হাঁড়ি, এই কথাটি নয় অজানা। আদর-আমোদ কাঁড়ি কাঁড়ি- থাকলে পাশে নানি-না...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : কালির কুহেলি ঘন, অক্ষর আজ অবরুদ্ধ, ফোরাম-চত্বরে ক্লাবের ছায়া—দ্বন্দ্ব বড় দুর্বোধ্য। মসনদের মায়à¦...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : সব কবিতা শব্দ দিয়ে শুরু হয় না; কিছু কবিতা শুরু হয় নীরবতা দিয়ে। কিছু কবিতা ভাষায় নয়, ভাষাহীনতাà...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : জুলাই— কোনো ক্যালেন্ডারের মাস নয়; রাষ্ট্রের বুকের ভেতর জমে থাকা বজ্রের মতো এক দীর্ঘ কম্পন। রা...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : নক্ষত্রেরও পূর্বের যে নিবিড় অন্ধকার, সেখানেই শব্দ খুঁজে পায় তার আদিম অনুরণন। একজন কবি শুধু পঙ্à¦...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited