শিরোনাম
আমাদের ডেস্ক : | ০৫:২৮ পিএম, ২০২৬-১০-০৮
চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানার ওয়্যারলেস কলোনির তালতলা এলাকায় গত ১ অক্টোবর ছুরিকাঘাতে কিশোর হৃদয়কে (১৬) হত্যার ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে কিশোর গ্যাংয়ের ভয়ংকর নেটওয়ার্কের তথ্য। ‘ফাইভ স্টার’ ও ‘সেভেন স্টার’—দুই কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। এরপরই জানা যায় চট্টগ্রামে ৬৪ বড় ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ২০০ কিশোর গ্যাং। এর মধ্যে একটি সেভেন স্টার গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা ওয়াকিল হোসেন। তিনি বগা নামে এলাকায় পরিচিত। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মেয়র শাহাদাত হোসেনের অনুসারী হিসেবেও পরিচিত।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী এবং একটি কিশোর গ্যাং গ্রুপের কথিত বড় ভাই হিসেবে পরিচিত বগা। সম্প্রতি একটি হত্যাকাণ্ডেও তার নাম এসেছে। তাকে গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তবে কথিত ক্ষমতাসীন নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকার কারণে তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানায় পুলিশ।
এর মধ্যে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র কার্যালয়ে বগা অবস্থান করছেন এমন গোপন তথ্য পেয়ে সেখানে যায় খুলশী থানা-পুলিশ। প্রথমে পুলিশ নগর ভবন ঘিরে ফেলে। পরে বগাকে গ্রেফতারে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন পুলিশকে বাধা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে তার বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপকমিশনার ফয়সাল আহমেদ উপস্থিত হন। পরে মেয়রের হস্তক্ষেপে পুলিশ অভিযান বন্ধ করে ফিরে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
তবে এসব কিশোর গ্যাংকে সামনে রেখে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, মাদক কারবার ও চাঁদাবাজির মতো কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে কথিত ‘বড় ভাইদের’ গ্রুপ। এসব বড় ভাইয়ের কারও কারও সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ওঠাবসা রয়েছে বলেও জানা গেছে।
২০০ কিশোর গ্যাংয়ে ১৪০০ সদস্য
২০১৮ সালে নগরের জামালখানে দুই কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধে ছুরিকাঘাতে কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনান ইসফার হত্যার পর কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের তৎপরতা বাড়ে। পরের বছর প্রথমবারের মতো কিশোর গ্যাং ও তাদের গডফাদারদের তালিকা তৈরি করে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি)। ২০২৪ সালের মার্চে ওই তালিকা হালনাগাদ করা হয়।
পুলিশের ওই তালিকা অনুযায়ী, নগর পুলিশের ১৬টি থানায় অন্তত ২০০টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এসব গ্যাংয়ে সদস্য রয়েছে ১ হাজার ৪০০ জন। উত্তর ও দক্ষিণ জোনের অধীনে ১১৯টি গ্যাং এবং পশ্চিম ও বন্দর জোনে বাকি ৮১টি গ্যাং রয়েছে। এসব গ্যাংকে পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে পাঁচ জন ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ ৬৪ জন ‘বড় ভাইয়ের’ তালিকাও করেছিল পুলিশ। তবে ২০২৪ সালের পর কিশোর গ্যাংয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা আর হালনাগাদ হয়নি। ফলে বর্তমানে কতটি গ্যাং সক্রিয়, তাদের সদস্য কতজন এবং আগের তালিকার কতজনের জায়গায় নতুন কারা এসেছে—তা নিয়ে রয়েছে বড় ধরনের তথ্য-ঘাটতি।
আলোচিত কিশোর গ্যাং
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও নগরের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি। বরং একাধিক ঘটনায় নতুন নতুন নাম সামনে এসেছে।
এর মধ্যে হালিশহরের ‘বিংগু’ ও ‘পাইথন’-এর পাশাপাশি খুলশী-পাহাড়তলী এলাকায় ‘ফাইভ স্টার’ ও ‘সেভেন স্টার’, বাকলিয়ায় ‘মুরাদ’ ও ‘জসিম’ গ্রুপ, জামালখান ও গনি বেকারি এলাকায় ‘ডেঞ্জার’ গ্রুপ, মুরাদপুরে ‘এমবিএস’, পাঁচলাইশে ‘কেবি’, ‘এনএস’, ‘এক্সমার্ক’, ‘ট্রিপল নাইন’ ও ‘ডট’ গ্যাং এবং চকবাজারে ‘ফোর জিরো সেভেন’সহ আমবাগান-ডেবারপাড় এলাকায় বিভিন্ন গ্রুপের নাম সাম্প্রতিক অপরাধের ঘটনায় উঠে এসেছে।
‘সেভেন স্টারের’ নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা বগা
পুলিশ ও কিশোর গ্যাংয়ের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে খুলশী থানার ওয়্যারলেস কলোনির তালতলা এলাকায় হৃদয় নামে এক কিশোর ছুরিকাঘাতে নিহত হন। ওই ঘটনার পর অভিযান চালিয়ে পুলিশ আট কিশোরকে গ্রেফতার করে। পুলিশের ভাষ্য, দুই কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে সিনিয়র-জুনিয়র নিয়ে বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহত হৃদয় ‘ফাইভ স্টার’ গ্যাংয়ের সদস্য ছিলেন। হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার আট জন ‘সেভেন স্টার’ গ্যাংয়ের সদস্য। ওয়াকিল হোসেন বগা ও রকিবুল ইসলাম ওরফে পিচ্চি ‘সেভেন স্টার’ গ্যাং পরিচালনা করেন। এর মধ্যে নেতৃত্বে আছেন বগা। অন্যদিকে স্থানীয় বিজয়, কামরান ও শান্তর নেতৃত্বে ‘ফাইভ স্টার’ গ্যাং পরিচালিত হয় বলে পুলিশের ভাষ্য।
কিশোর গ্যাংয়ের যত অপকর্ম
এলাকায় মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার, ইট-বালু সরবরাহ, চাঁদাবাজি, জমি দখল, ফুটপাতে হকার নিয়ন্ত্রণ ও ছিনতাইসহ নানা অপকর্মে কিশোর অপরাধীদের নাম আসছে। এমনকি ভাড়াটে খুনি হিসেবেও কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত ১ অক্টোবর রাতে নগরের খুলশীর ওয়্যারলেস কলোনিতে ১৬ বছর বয়সী মো. হৃদয় হত্যার ঘটনাকেও দুই কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বের বলি বলছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, ফাইভ স্টার গ্রুপের সদস্য হৃদয়ের সঙ্গে সেভেন স্টার গ্রুপের সদস্যদের সিনিয়র-জুনিয়র নিয়ে বিরোধ চলছিল। সেই বিরোধের জেরে হৃদয়কে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আট জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গ্রেফতারকৃতদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ জানিয়েছে, ফাইভ স্টারের নেতৃত্বে রয়েছে বিজয়, কামরান ও শান্ত; আর সেভেন স্টারের নেতৃত্বে রয়েছে ওয়াকিল হোসেন বগা। এসব গ্রুপের সদস্যরা অস্ত্রবাজি, জায়গা দখল, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
ওয়াহিদুলকে হত্যা
এর আগে ২০২৫ সালের ১৬ মে হালিশহরের নয়াবাজার এলাকায় ওয়াহিদুল হক ওরফে সাব্বিরের (১৮) ওপর হামলা করা হয়। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় দিন পর তিনি মারা যান। পুলিশ জানিয়েছে, দুই কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বের কারণে ওয়াহিদুলকে হত্যা করা হয়।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, নিহত ওয়াহিদুল ‘বিংগু’ নামের একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ছিলেন। প্রতিপক্ষ ‘পাইথন’ গ্যাংয়ের সদস্যরা তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। পরে প্রকাশ্যে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। আহত অবস্থায় ওয়াহিদুল দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলেও হামলাকারীরা তার পিছু নেয়। লোহার রড ও লাঠি দিয়ে আবারও তাকে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
ওয়াহিদুলের বাবা মোহাম্মদ এসহাক অভিযোগ করেন, তার ছেলে ‘পাইথন’ গ্যাংয়ে যেতে রাজি না হওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়েছে।
সম্প্রতি বাকলিয়ার সৈয়দ শাহ রোডে মাদক কারবার ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মুরাদ ও জসিম গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানায়, স্থানীয় দুই গ্রুপের সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা যুক্ত ছিল। ঘটনায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও বিস্ফোরণের শব্দে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করা হয়। মুরাদের বিরুদ্ধেও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে।
গত ১২ এপ্রিল বাকলিয়ায় কলেজছাত্র আশফাক কবির সাজিদকে মারধরের পর আটতলা ভবনের ছাদ থেকে ফেলে হত্যার ঘটনায়ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছিল পুলিশ। শুধু নগরী নয়, জেলার উপজেলাগুলোতেও কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
যা বলছে পুলিশ
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাসুদ আলম জানিয়েছেন, জেলায়ও কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চলছে। তাদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করা হচ্ছে।
একই কথা বলেছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ। তিনি বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান আছে এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কিশোর গ্যাংয়ের বড় ভাইদের বিষয়ে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত তাদের ছাড়িয়ে নিতে কেউ তদবির করেনি।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, ‘নগরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধীদের ব্যাপারে পুলিশ সক্রিয় আছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।’
স্টাফ রিপোর্টার : : চট্টগ্রাম নগরের স্কুলকেন্দ্রিক যানজট নিরসনে গৃহীত কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি পর্যালোচনা ও পরবর্তী ...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : মাদক, সন্ত্রাস ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে তরুণ প্রজন্মকে দূরে রাখতে খেলাধুলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন à¦...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : “আপনার চোখকে ভালোবাসুন” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম রেঞ্জের ১১ জেলায় কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও মাদকবিরোধী অভিযà¦...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : মাদক, সন্ত্রাস ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে তরুণ প্রজন্মকে দূরে রাখতে খেলাধুলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন à¦...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এবং যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা ঠেকাতে চট্টগ্রাম বà¦...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited