শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৮:০৯ পিএম, ২০২৫-০৭-০৭
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পর্ব - ১
মুনির চৌধুরী : পদ্মা, মেঘনা, যমুনা অয়েল কোম্পানি বছরে কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনলেও বিপুল অর্থ বিত্তের মালিক হচ্ছেন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, কর্মচারী ও তেল ছুরি সিন্ডিকেট চক্রটি।
রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ২১ ডিপো থেকে তেল চুরির অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অপকর্মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকালেও রহস্যজনক কারণে পার পেয়ে যায় তেল চুরির সাথে জড়িত সিন্ডিকেটের গডফাদাররা।
অভিযোগ রয়েছে, খোদ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. টিপু সুলতান তেল চুরির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিপত্তিতে পড়েছেন নিরাপত্তাকর্মীসহ অনেকেই। প্রতি মাসে তেল চুরির ১০ কোটি টাকা যাচ্ছে সিন্ডিকেটের পকেটে। এমডি পাচ্ছেন আয়ের অর্ধেক।
অভিযোগ সূত্র বলছে, সারা দেশের ২১টি ডিপোতে তেল সরবরাহ করা হয়। প্রতিটি লরিতে (তেলবাহী গাড়ি) ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন মিলে গড়ে ৯ হাজার লিটার জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। এসব লরির ধারণক্ষমতা ১০ হাজার লিটার। দুর্ঘটনা এড়াতে এক হাজার লিটারের জায়গা সাধারণত ফাঁকা রাখা হয় প্রতিটি লরিতে।
কেউ চাইলে সর্বোচ্চ সাড়ে ৯ হাজার লিটার পর্যন্ত তেল পরিবহন করতে পারে। মূলত যে স্থানটি ফাঁকা থাকে সেখানেই ২০০ থেকে ৫০০ লিটার পর্যন্ত অতিরিক্ত তেল পরিবহন করে চক্রটি। এই তেলের জন্য কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয় না। তেলবাহী লরি বাইরে বের হওয়ার পর সুবিধাজনক স্থানে ওই তেল নামিয়ে তা বিক্রি করে দেয়া হয়। প্রায় প্রতিদিনেই চলে এভাবে তেল চুরি। পরে চুরি করা তেল সিস্টেম লস, ট্রান্সপোর্ট লস হিসেবে মেঘনা কর্তৃপক্ষ সমন্বয় করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি এমআই, ফতুল্লা, বাগাবাড়ি, পতেঙ্গা গুপ্তখাল এলাকায় মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ডিপো থেকে তেলবাহী গাড়ি বের হওয়ার সময় দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীরা তা পরীক্ষা করতে গেলে তারা বাঁধার মুখে পড়েন। এ সময় তাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। কিন্তু পরে এই ঘটনা জানাজানি হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো নিরাপত্তাকর্মীদের চাকরি হারানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র বলছে, প্রতিষ্ঠানটির ঢাকা জোনের ডিজিএম মো.লুৎফর রহমান এমডির ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পালন করছেন। ডিপো থেকে প্রতি মাসে টাকা কালেকশন করেন তিনি। এর পরে সিন্ডিকেটের সঙ্গে ভাগ করে নেন।
সম্প্রতি মেঘনা পেট্রোলিয়ামের প্রধান স্থাপনা থেকে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে মেসার্স আবদুর রউফ অ্যান্ড সন্সের নামে একটি গাড়িতে তেল ভর্তি করা হয়। গাড়িটি ‘সিকিউরিটি পয়েন্টে’ পৌঁছানোর পর সন্দেহ হলে অতিরিক্ত একটি ড্রাম পাওয়া যায়, যেখানে প্রায় ২০০ লিটার ডিজেল ছিল। একইভাবে গত সপ্তাহে ফতুল্লা ডিপোতে গিয়ে দেখা গেছে দুটি গাড়িতে তেল ভর্তি করে বের হচ্ছেন। এই সময় গাড়িতে অতিরিক্ত একটি ড্রাম দেখা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, সরাসরি তেল চুরির সঙ্গে জড়িতদের বেশির ভাগই শ্রমিক। এদের পরোক্ষ সহায়তা করছেন কোম্পানির ব্যবস্থপনা পরিচালক মো. টিপু সুলতান। কেউ এদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলে তাকে নানাভাবে হেনস্তা করা হয়। বিশেষ করে নিরাপত্তাকর্মীরা নানা রকম ভয়ভীতির শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
বিশ্বস্থ সূত্রে জানা যায়, মোটা অংকের টাকা দিয়ে মেঘনার এমডি টিপু সুলতান পদন্নোতি নিয়েছিলেন ।
নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও এর অধীন অঙ্গ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কোম্পানির এমডি করার কথা থাকলেও এই ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। বিপিসির জ্যেষ্ঠতার তালিকায় থাকা ১০ জনকে ডিঙিয়ে ১১ নম্বরে থাকা এমপিএলের মহাব্যবস্থাপক (মানব সম্পদ) টিপু সুলতানকে প্রতিষ্ঠানটির এমডি করা হয়।
বিপিসির অঙ্গ প্রতিষ্ঠান/আওতাধীন কোম্পানিসমূহের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নীতিমালা-২০১৭তে উল্লেখ করা হয়েছে, কোম্পানির এমডি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে একজন প্রার্থীকে পূর্বতন পদে ন্যূনতম ২ বছরসহ নির্বাহী পদে (সহকারী ব্যবস্থাপক) পদে ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এরপর একজন কর্মকর্তার বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর), কর্মদক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতাকে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
নীতিমালায় এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে এসব শর্ত থাকলেও এমপিএলে এমডি নিয়োগে তা শর্ত মানা হয়নি। অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা, জ্যেষ্ঠতাসহ সব দিক থেকে এগিয়ে থাকার পরও বিপিসি এবং অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের ১০ জন কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে তাদের চেয়ে তুলনামূলক কম যোগ্যতাসম্পন্ন টিপু সুলতানকে এমপিএলের এমডির দায়িত্ব দেওয়া হয় মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে।
যেভাবে চুরি হয় জ্বালানী তেল:
জ্বালানী তেল বিক্রির সাথে সংশ্লিষ্ট এমন একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ডেলিভারির সময় ডিপো থেকে পরিমাপে তেল কম দেয় সরকার নিয়ন্ত্রিত জ্বালানী তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিঃ (এমপিএল)। আবার প্রয়োজনের অতিরিক্ত সিস্টেম লস দেখানো হয়। এভাবে অতিরিক্ত তেল তারা সুযোগ বুঝে তাদের নিধারিত পার্টির কাছে অপেক্ষাকৃত কম দামে বিক্রি করে। সঠিক পরিমাপে তেল না পাওয়ায় আরেক দফা চুরি করে পাম্প মালিক ও কর্মচারীরা। আর চোর সিন্ডিকেটের পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেন প্রতিষ্ঠানের এমডি। এভাবে গ্রাহকের কাছে পৌছাতে শতকরা ৫ থেকে ৬ শতাংশ তেল চুরি হয়ে যায়। যার প্রভাব পড়ে পরিবহন থেকে শুরু করে পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয়ের ক্ষেত্রে।
বদলেছে চুরির কৌশল:
বিগত সময়ে তেল চুরির সাথে জড়িত পেট্রোল পাম্পকে মাঝে মাঝে আইনের আওতায় আনতে পারলেও বর্তমানে এরা কৌশল বদলিয়ে ডিভাইস বসিয়ে তেল চুরি করছে। যা ধরা খুবই কঠিন বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে। তারা বলছেন, তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান মেঘনা সঠিক পরিমাপে তেল দেয়না। সেখান থেকেই চুরিটা শুরু হয়। আর চুরি করে যে তেল তারা জমায় তা পরে অন্যত্র অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে বিক্রি করে দেয়। পাম্পে আগে এনালগ মিটারে তেল বিক্রি করা হতো। এখন সব পাম্পে তেল বিক্রির জন্য বিএসটিআই অনুমোদিত ডিজিটাল মিটার ব্যবহার করা হয়।
বিএসটিআই, ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতর ও র্যাব প্রায়ই অভিযান চালিয়ে তেল কম দেওয়ার অভিযোগে জরিমানা ও পেট্রোল পাম্পের সংশ্লিষ্ট ইউনিট সিলগালা করে দেয়। কিন্তু এখন তেল মাপে কম দেওয়ার জন্য ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করা হয়। ডিভাইসটি পাম্পের ভেতরে লাগানো হয়। এটা লাগিয়ে দিলে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল স্বয়ংক্রিয়ভাবে কম বের হবে। কেউ বুঝতে পারবে না। আবার কোন সংস্থা অভিযান চালালে তা এক মিনিটের মধ্যেই সঠিক পরিমাপে সেট করা সম্ভব। ডিভাইসটির জন্য আলাদা টেকনিশিয়ান আছে। সে এসে নিজেই ডিভাইস লাগিয়ে দেয়। এই ডিভাইসের সঙ্গে আবার সুইচ রয়েছে। ইচ্ছামতো সুইচ অন-অফ করা যায়। এই পদ্ধতিতে লিটারে ৪০/৫০ এমএল তেল অনায়াসে কম দেওয়া যায়। ডিভাইসটি এমনভাবে বসানো হয়, যা দেখা যায় না। বিএসটিআইর লোকজন উপস্থিত হলে মুহূর্তের মধ্যে সবার অলক্ষ্যে ডিভাইসটি অফ করে দেওয়া সম্ভব। তাহলে আর কারচুপি ধরা পড়বে না।
এ ব্যাপারে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. টিপু সুলতানের সাথে বার বার যোগাযোগ চেষ্টা করেও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের অসাধু কর্মকর্তা, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, কর্মচারী, সিবিএ নেতা, সার্ভে প্রতিষ্ঠান (১৬ বছর ধরে অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্ত), চিন্হিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারি সমিতির নেতৃবৃন্দ, পোটল্যান্ড গ্রুপের মিজান গং, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা'র দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, কর্মচারী, ফ্যাসিস সরকারের এমপি, মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, সরকারী আমলাসহ তেল চুরি চক্রের সংশ্লিষ্টরা পদ্মা, মেঘনা, যমুনা অয়েল ডিপো ও কর্ণফুলী নদীতে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারী জ্বালানি তেল বিক্রি, লাইটার জাহাজের মাধ্যমে বিভিন্ন ডিপোতে তেল পাচার ও দুর্নীতির মাধ্যমে গত ১৪ বছরে তেল চুরির মাফিয়া সিন্ডিকেটটি ৫০ হাজার কোটি টাকা আয় করেছে ও বিদেশে পাচার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম মহানগরের পদ্মা, মেঘনা,যমুনা অয়েল ডিপোর দুর্নীতি ও তৈল মাফিয়া সিন্ডিকেটের হাজার কোটি টাকার বিষয়ে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) তেল চুরির মাফিয়া সিন্ডিকেটের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়।
গত ০৪/০৫/২৫ইং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ( অপারেশন) মো: রফিকুল আলম কে আহবায়ক, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপ সচিব ( পরিকল্পনা শাখা -৩) দেওয়ান মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সদস্য সচিব ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পরিচালক ( বিপণন ও যুগ্মসচিব) মোহাম্মদ কাদের কে সদস্য করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
উক্ত কমিটি কে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়।
( চলবে)
স্টাফ রিপোর্টার : : সিআইডির ওসি পরিচয়ে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের ফোন করে তদন্তের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উ...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরা ভুইয়া গলিতে ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক এমপি ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহ...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : সম্পদ বিবরণীতে তথ্য গোপন এবং জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযো...বিস্তারিত
কুতুবদিয়া প্রতিনিধি :: : কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় পারিবারিক বিরোধের জেরে ঘরে ঢুকে তপসি দাস (৪২) নামে এক গৃহবধূকে কুপিয়ে হত্য...বিস্তারিত
আলমগীর মানিক, রাঙামাটি : রাঙামাটিতে এক নারীকে ধর্ষণ করে সেই ঘটনার স্থিরচিত্র ও ভিডিও ধারণ, পরবর্তীতে সেগুলো দেখিয়ে দীর্ঘদ...বিস্তারিত
স্টাফ রিপোর্টার : : ফেনীর ছাগলনাইয়া ও ফুলগাজী সীমান্তে ২৫ লক্ষ টাকার ৮২ কেজি গাঁজা সহ ভারতীয় পন্য জব্দ করেছে বর্ডার গা...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited