চট্টগ্রাম   বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬  

শিরোনাম

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে প্রফেসর ড. এস কে আকরাম আলী

আমাদের ডেস্ক :    |    ১২:১০ এএম, ২০২৫-০৯-১১

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে প্রফেসর ড. এস কে আকরাম আলী

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে এটি জন্ম নেয় এক বিপ্লবী সেনাবাহিনী হিসেবে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সংসদ সদস্য কর্নেল এম এ জি ওসমানী নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং গেরিলা কৌশলে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় পূর্ব পাকিস্তানকে সাতটি সেক্টরে ভাগ করা হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তিন তরুণ অফিসার—মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর মোহাম্মদ সফিউল্লাহ এবং মেজর খালেদ মোশাররফ—বিদ্রোহ করে স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন। এদের মধ্যে মেজর জিয়া শুধু বিদ্রোহই করেননি, ২৬ মার্চ ১৯৭১ তিনি স্বাধীনতার ঘোষণাও দেন।
স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনী নানা সংকটের মুখোমুখি হয়। 

দুঃখজনকভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার সেনাবাহিনীকে অবহেলিত রাখে, যদিও স্বাধীনতা অর্জনে এর অবদান ছিল সর্বাধিক। এমনকি সেনাবাহিনীকে দুর্বল করতে ভারতপন্থি রক্ষিবাহিনী ( জেআরবি ) নামের আধা-সামরিক বাহিনীও গঠন করা হয়।

শেখ মুজিবুর রহমানের  হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনী দীর্ঘ সংকট অতিক্রম করে। অবশেষে সত্তর দশকের শেষভাগে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে এটি একটি পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে ওঠে। মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা ভিত্তি স্থাপন করলেও পুনর্বাসিত (repatriated) অফিসাররা সেনাবাহিনীর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বর্তমান সেনাবাহিনী এই দুই ধারার সম্মিলিত অবদানের ফল।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি অনন্য বৈশিষ্ট্যের বাহিনী—এতে মুক্তিযোদ্ধা অফিসার, যুদ্ধকালীন কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার, পুনর্বাসিত অফিসার, জেআরবি অফিসার এবং বিএমএ কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার—সবাই ছিলেন। সামরিক ইতিহাসের শিক্ষার্থী হিসেবে আমি অন্য কোথাও এত বৈচিত্র্যময় পটভূমির অফিসার ও সৈন্যদের সমন্বয়ে গঠিত বাহিনী দেখিনি।

জিয়াউর রহমান একের পর এক সংকট দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অর্জিত অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি শুধু সেনাপ্রধান হিসেবেই নয়, বরং আধুনিক ইতিহাসে এক অসাধারণ জেনারেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। সেনাবাহিনী পরিচালনার পাশাপাশি দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিও দক্ষভাবে পরিচালনা করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল একটি নিরপেক্ষ, পেশাদার সেনাবাহিনী গড়ে তোলা—যা তিনি বাস্তবায়ন করেন।

তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি সবসময় মুক্তিযোদ্ধা জেনারেলদের ওপর নির্ভর করতে পারেননি। যেমন, মেজর জেনারেল মীর শওকত আলী ও মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মঞ্জুরের ক্ষেত্রে। বাধ্য হয়ে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদকে সেনাপ্রধান করেন। কিন্তু উচ্চাভিলাষী মেজর জেনারেল মঞ্জুর ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করলে তা ব্যর্থ হয়। আমি তখন চট্টগ্রামে থাকায় এ ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলাম।

এরশাদ সেনাবাহিনীকে পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন এবং কিছুটা সফলও হন। কিন্তু রাজনৈতিক ভুলের কারণে ডিসেম্বর ১৯৯০-এ তাঁকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়, যখন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ নূরুদ্দিন খান সামরিক দমন-পীড়নের নির্দেশ অস্বীকার করেন। ফলে দেশ এক সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ থেকে রক্ষা পায়।
খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারে মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা পুনরায় প্রভাবশালী হন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাসিম সেনাপ্রধান হন। কিন্তু তিনি রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করলে তা ব্যর্থ হয়। রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাসের দৃঢ় ভূমিকা এবং জেনারেল আব্দুল মতিন ও জেনারেল ইমামুজ্জামানের দেশপ্রেমিক পদক্ষেপের কারণে অভ্যুত্থান ভেস্তে যায়। এরপর বিএনপি আরও সাবধান হয়ে জেনারেল মাহবুবউদ্দিনকে সেনাপ্রধান করেন।
অন্যদিকে শেখ হাসিনা অবসরপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল মুস্তাফিজকে সেনাপ্রধান করেন, যিনি বর্তমান সেনাপ্রধানের শ্বশুর হলেও ব্যক্তিগতভাবে একজন সৎ মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

২০০১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় ফিরে এসে পুনর্বাসিত জেনারেল হাসান মাসউদ চৌধুরীকে সেনাপ্রধান করেন। কিন্তু বড় ভুল হয় যখন জেনারেল মঈন উদ্দিন আহমেদকে সেনাপ্রধান করা হয়। তিনি প্রথম বিএমএ কমিশনপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান হলেও তাঁর আমলে সেনাবাহিনী ভেঙে পড়ে এবং ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে বিডিআর হত্যাকাণ্ড সেনাবাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।

এরপর থেকে ভারতীয় প্রভাবের অধীনে সেনাবাহিনীকে দলীয়করণ শুরু হয়, যা শেখ হাসিনার পতন (আগস্ট ২০২৪) পর্যন্ত চলতে থাকে। এ সময়ের সেনাপ্রধানরা সেনাবাহিনীকে পেশাদার বাহিনী থেকে দলীয় বাহিনীতে পরিণত করার দায় এড়াতে পারেন না। ব্যক্তিগত স্বার্থে জেনারেল মঈন উদ্দিন ও জেনারেল তারেক সিদ্দিকীর মতো কয়েকজন সেনানায়ক আত্মঘাতী ভূমিকা পালন করেন।

ভারতের নির্দেশনায় সেনাবাহিনীর রাজনীতিকরণ শুরু হয় এবং তা ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতন পর্যন্ত চলতে থাকে। এ সময়ের সেনাপ্রধানরা একটি পেশাদার বাহিনীকে দলীয় বাহিনীতে পরিণত করেন। বিশেষত জেনারেল মইনউদ্দীন ও জেনারেল তারেক সিদ্দিক ব্যক্তিস্বার্থে আত্মঘাতী খেলায় মেতে ওঠেন।
বিগত সময়ে বহু ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে, যেগুলোকে আমি pro-Indian উদ্যোগ বলে মনে করি। তবে দেশপ্রেমিক সৈনিকরা সেগুলো প্রতিবারই প্রতিহত করেছে। বিশ্বাস করা হয়, শেখ মুজিবের পতন ঘটানো অভ্যুত্থান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থিত এবং জেনারেল মইনউদ্দীনও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মদদে ক্ষমতা দখল করেন। ভবিষ্যতেও ভারত-সমর্থিত কোনো সামরিক উদ্যোগ সফল হবে না। বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সৈনিকরা ভারতের আধিপত্য আর কখনো মেনে নেবে না।

জাতি শ্রদ্ধা জানায় বর্তমান সেনাপ্রধানকে, যিনি ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের শেষ পর্যায়ে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তাঁর ক্ষমতার প্রতি কোনো লোভ নেই—এই বিশ্বাসে আমরা আশা করি তিনি সেনাবাহিনীকে আবারও পেশাদার বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি অতীতের কিছু মহান সেনানায়কের নাম উল্লেখ না করা হয়। তাঁরা হলেন জেনারেল এম এ জি ওসমানী, মেজর জেনারেল মোহাম্মদ সফিউল্লাহ, কর্নেল অলি আহমেদ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল আতীকুর রহমান, মেজর জেনারেল আব্দুল মান্নাফ, মেজর জেনারেল মোজাম্মেল হক, মেজর জেনারেল আমজাদ আহমেদ খান চৌধুরী, মেজর জেনারেল আব্দুর রহমান, মেজর জেনারেল আব্দুস সামাদ, মেজর জেনারেল কে এম ওয়াহেদ এবং মেজর জেনারেল রফিকুল ইসলাম।
অন্যদিকে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে যারা সেনাবাহিনীকে দলীয় বাহিনীতে রূপান্তরের চেষ্টা করেছেন, তাদের আমরা নিন্দা করতে ভুলি না।

আজ অনেকে সেনাবাহিনী সংস্কারের দাবি তুলছেন, কিন্তু সুস্পষ্ট নীতি দিচ্ছেন না। আমার মতে, সংস্কারে প্রয়োজন বিচক্ষণতা, অভিজ্ঞতা ও আধুনিক সামরিক জ্ঞানসম্পন্ন পেশাদারদের মতামত। সঠিক প্রক্রিয়ায় যোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচন এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ মডিউল প্রবর্তনই ভবিষ্যতের প্রকৃত নেতৃত্ব তৈরি করবে।

ভবিষ্যৎ সরকারকে অবশ্যই স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্ব থেকে দূরে থেকে কেবল পেশাদার দক্ষতা ও চরিত্রকে প্রাধান্য দিতে হবে। অন্যথায় অতীতের মতো বিপর্যয় অনিবার্য হবে। ন্যায়বিচারই সমাজের সব সমস্যার সমাধান করতে পারে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে জাতির সেবায় এগিয়ে যেতে দিন—মাথা উঁচু করে।

রিটেলেড নিউজ

মেয়াদ ফুরাল, নির্বাচন হলো না

মেয়াদ ফুরাল, নির্বাচন হলো না

আবদুল্লাহ মজুমদার : : চট্টগ্রাম নগরীর রাস্তায় প্রতিদিনের যানজট, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, বর্জ্যের স্তূপ আর নাগরিক দুর্ভোগের ম...বিস্তারিত


রাঙামাটিতে বিশেষ অভিযান: মাদক কারবারি ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগে আটক ১২

রাঙামাটিতে বিশেষ অভিযান: মাদক কারবারি ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগে আটক ১২

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি : : রাঙামাটিতে কোতয়ালী থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে মাদক কারবারি, মাদকসেবী, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযà...বিস্তারিত


সড়ক দুর্ঘটনায় আর কত প্রাণ গেলে টনক নড়বে? নিরাপদ সড়কের দাবি দেশজুড়ে

সড়ক দুর্ঘটনায় আর কত প্রাণ গেলে টনক নড়বে? নিরাপদ সড়কের দাবি দেশজুড়ে

মো.আরফান উদ্দীন  : পৃথিবীর আর কোন দেশে বাংলাদেশের মতো প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় এত মানুষের প্রাণহানি ঘটে কি না, তা আমার...বিস্তারিত


মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: নীরব কূটনীতি, অনুত্তরিত প্রশ্ন ও রাষ্ট্রের দায়

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: নীরব কূটনীতি, অনুত্তরিত প্রশ্ন ও রাষ্ট্রের দায়

আবদুল্লাহ মজুমদার : : একটি মৃত্যুদণ্ডের খবর কখনো কখনো একটি পরিবারের শোকের সীমানা ছাড়িয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধকেই কাঠগà§...বিস্তারিত


লায়ন্স ও লিও ক্লাব অব চিটাগং কর্ণফুলী এলিটের উদ্যোগে দিনব্যাপী সেবামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত

লায়ন্স ও লিও ক্লাব অব চিটাগং কর্ণফুলী এলিটের উদ্যোগে দিনব্যাপী সেবামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত

আমাদের ডেস্ক : : লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল, জেলা ৩১৫-বি৪, বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগং কর্ণফুলী এল...বিস্তারিত


বরেণ্য কবি নূরুল হকের সাথে লায়ন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের সৌজন্য সাক্ষাৎ

বরেণ্য কবি নূরুল হকের সাথে লায়ন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের সৌজন্য সাক্ষাৎ

আমাদের ডেস্ক : : কবিতা, সাহিত্য এবং আন্তর্জাতিক সাহিত্য বিনিময়ে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানজনক সার্...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

মন্ত্রণালয়ের আদেশ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিডিএ-তে শিকড় গেঁড়েছেন হারুন!

মন্ত্রণালয়ের আদেশ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিডিএ-তে শিকড় গেঁড়েছেন হারুন!

নিজস্ব প্রতিবেদক : ​সরকারি আদেশ মানেই যেন মগের মুল্লুক! গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট বদলি আদেশকে তোয়াক্কা নà¦...বিস্তারিত


নেশনস কাপের ফাইনালে মুখোমুখি সালাহ-মানে

নেশনস কাপের ফাইনালে মুখোমুখি সালাহ-মানে

স্পোর্টস ডেস্ক : : ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের জায়ান্ট লিভারপুলের জার্সিতে খেলেন দুজনেই। আক্রমণভাগে দুজনের রসায়নে অলরেড...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর