শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৮:৩৭ পিএম, ২০২৬-০৭-১৮
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) নতুন মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছে সংস্থাটির ডিজিটাল সেবা উদ্যোগ। তবে উদ্বোধনের আগেই এই অ্যাপকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে বহুমাত্রিক বিতর্ক। একদিকে রয়েছে অতীতের একাধিক ব্যর্থ ডিজিটাল প্রকল্পের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের নিবন্ধিত ও সরকারি তালিকাভুক্ত একটি সংবাদপত্রের নাম হুবহু ব্যবহার করার অভিযোগে দেখা দিয়েছে আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন।
সমালোচকদের দাবি, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে অতীতে চালু হওয়া একাধিক ডিজিটাল প্রকল্প স্থায়ীভাবে সচল রাখতে ব্যর্থ হওয়ার পরও নতুন করে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে আরেকটি অ্যাপ চালুর আগে প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন ও পরিকল্পনার ঘাটতি রয়ে গেছে। একই সঙ্গে ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ নামটি বহু বছর ধরে প্রকাশিত একটি নিবন্ধিত সংবাদপত্রের সঙ্গে অভিন্ন হওয়ায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
প্রতিবাদ ও পূর্বের ব্যর্থতা উপেক্ষা করে উদ্বোধন করলেন মেয়র:
শনিবার (১৮ জুলাই) সকালে চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপের উদ্বোধন করেন।
চসিকের ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যাপটির মাধ্যমে নাগরিকরা রাস্তা, জলাবদ্ধতা, মশার উপদ্রব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়কবাতি, নালা-নর্দমা, অবৈধ স্থাপনা, পাবলিক টয়লেটসহ বিভিন্ন নাগরিক সমস্যার ছবি ও অবস্থানসংবলিত অভিযোগ সরাসরি সিটি কর্পোরেশনে পাঠাতে পারবেন। অভিযোগের অগ্রগতি লাইভ ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এছাড়া হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স, জরুরি হটলাইন, বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্রের আবেদন এবং জনপ্রতিনিধিদের যোগাযোগ তথ্যও অ্যাপটিতে যুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (সিএসআর) কর্মসূচির আওতায় ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড (ইবিএল) অর্থায়ন করেছে এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করেছে ভেনটো টেক।দীর্ঘদিনের নিবন্ধিত পত্রিকার নামেই অ্যাপ
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অ্যাপটির নাম।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম’ নামে একটি নিবন্ধিত আঞ্চলিক দৈনিক বহু বছর ধরে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে। পত্রিকাটি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের (ডিএফপি) অনুমোদিত তালিকাভুক্ত সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম।
পত্রিকা সংশ্লিষ্টদের দাবি, তাদের পত্রিকা প্রতিদিন চসিকের মেয়র কার্যালয়, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তর, জনসংযোগ বিভাগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ে সরবরাহ করা হয়। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পত্রিকাটির নাম অজানা থাকার সুযোগ নেই।
তাদের প্রশ্ন, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে নতুন অ্যাপ চালুর আগে নাম যাচাই-বাছাই বা বিদ্যমান কোনো প্রতিষ্ঠান একই নাম ব্যবহার করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়েছিল কিনা।
অজ্ঞতা নাকি প্রশাসনিক উদাসীনতা?:
প্রশ্ন উঠেছে, যে নাম বহু বছর ধরে একটি সংবাদপত্র ব্যবহার করছে এবং যা সরকারি নথিতেও বিদ্যমান, সেই নামই হুবহু ব্যবহার করে সরকারি একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলো?
তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্র্যান্ডিং বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি বা বেসরকারি যে কোনো প্রতিষ্ঠান নতুন সেবা চালুর আগে নামের স্বতন্ত্রতা, সম্ভাব্য বিভ্রান্তি এবং আইনি ঝুঁকি যাচাই করে থাকে। বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে একটি নামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ড পরিচিতি, অনলাইন উপস্থিতি ও জনআস্থা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তাদের মতে, বিকল্প হিসেবে ‘আমার চট্টগ্রাম’ বা অন্য কোনো স্বতন্ত্র নাম ব্যবহার করা হলে এ ধরনের বিতর্ক এড়ানো সম্ভব ছিল।
আইনি জটিলতার আশঙ্কা:
আইনজীবীদের মতে, দীর্ঘদিনের ব্যবহৃত ও প্রতিষ্ঠিত কোনো নাম হুবহু ব্যবহার করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তারা বলছেন, যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মনে করে যে নতুন নাম ব্যবহারের কারণে তাদের সুনাম, ব্র্যান্ড পরিচিতি বা ব্যবসায়িক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই ও নথিপত্র পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যথায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
আগের ৬ ডিজিটাল উদ্যোগের ব্যর্থতার ইতিহাস:
নতুন অ্যাপ নিয়ে আলোচনার আরেকটি বড় কারণ চসিকের অতীত অভিজ্ঞতা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত এক যুগে চসিক বিভিন্ন সময়ে একাধিক ডিজিটাল প্রকল্প চালু করলেও অধিকাংশই স্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখতে পারেনি।
হোল্ডিং ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম:
২০১২ সালে হোল্ডিং ট্যাক্স ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে একটি ডিজিটাল সিস্টেম ও পৃথক ওয়েবসাইট চালু করা হয়। প্রকল্পে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১৮ লাখ টাকা। কিন্তু পরবর্তীতে সেটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর রাখা সম্ভব হয়নি।
নাগরিক অভিযোগ কলসেন্টার:
২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল চালু হয় নাগরিক অভিযোগ কেন্দ্র ১৬১০৪। প্রথম দিকে ব্যাপক সাড়া পেলেও কয়েক বছরের মধ্যে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
সিটি সেবাবিষয়ক অ্যাপ:
২০২০ সালে নাগরিক সেবা সহজ করার লক্ষ্যে আরেকটি অ্যাপ চালু করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ সংক্রান্ত জটিলতায় দুই বছরের মাথায় সেটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় বলে জানা গেছে।
ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস):
চসিকের যানবাহনে জ্বালানি অপচয় ও অনিয়ম রোধে ২০১৫ সালে ভিটিএস চালু করা হয়। পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে শুরু হলেও কয়েক মাসের বেশি স্থায়ী হয়নি।
পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম তদারকি:
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের উপস্থিতি ও কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছিল। কিছুদিন ইতিবাচক ফল মিললেও পরে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।
বিভিন্ন অটোমেশন প্রকল্প:
হোল্ডিং ট্যাক্স, বাণিজ্যিক হোল্ডিং শনাক্তকরণ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল করার লক্ষ্যে একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হলেও অনেক উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এবারও কি জনবল সংকট বড় বাধা?:
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি নাগরিক সেবা অ্যাপ তৈরি করাই শেষ কথা নয়; বরং সেটিকে নিয়মিত পরিচালনা, অভিযোগ যাচাই, দ্রুত সমাধান এবং সার্ভার ও সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ ও নিবেদিত জনবল প্রয়োজন।
তাদের মতে, নাগরিকদের পাঠানো হাজার হাজার অভিযোগ বাস্তবে নিষ্পত্তি করতে না পারলে অ্যাপটি কেবল অভিযোগ গ্রহণের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হবে। এতে জনআস্থা তৈরি হওয়ার বদলে উল্টো হতাশা বাড়তে পারে।
অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন:
চসিক সূত্রে বলা হয়েছে, অ্যাপটির অর্থায়ন করেছে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের সিএসআর তহবিল। তবে প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো, ভবিষ্যৎ পরিচালন ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ডিজিটাল সেবার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। কিন্তু অতীতের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি হলে জনগণের অর্থ, সময় ও প্রত্যাশা -সবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
চসিকের বক্তব্য:
চসিকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপটি সম্পূর্ণভাবে নাগরিক সেবা উন্নয়নের লক্ষ্যে চালু করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে জনগণ সরাসরি সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারবেন। তবে দীর্ঘদিনের নিবন্ধিত সংবাদপত্রের সঙ্গে নামের মিল এবং এ বিষয়ে কোনো পূর্ব যাচাই করা হয়েছিল কি না -এমন প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এখন নজর বাস্তব ফলাফলের দিকে:
চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, নাম নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অ্যাপটির কার্যকারিতা। অতীতে ব্যর্থ হওয়া ডিজিটাল প্রকল্পগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি এটি দীর্ঘমেয়াদে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে পারে, তবে উদ্যোগটি সফল হবে। অন্যথায় এটি কোটি টাকার আরেকটি অচল প্রকল্প হিসেবে যুক্ত হবে চসিকের ব্যর্থ উদ্যোগের তালিকায়।
এদিকে একই নামে দীর্ঘদিনের নিবন্ধিত সংবাদপত্রের অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও সরকারি প্রতিষ্ঠানের এমন নাম নির্বাচন কতটা যৌক্তিক এবং এর ফলে কোনো আইনি জটিলতা সৃষ্টি হয় কি না -সেটিও এখন নগরবাসীর আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।
আবদুল্লাহ মজুমদার : : চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের পুরোনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনà¦...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : চট্টগ্রাম নগরীর রাস্তায় প্রতিদিনের যানজট, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, বর্জ্যের স্তূপ আর নাগরিক দুর্ভোগের ম...বিস্তারিত
রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি : : রাঙামাটিতে কোতয়ালী থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে মাদক কারবারি, মাদকসেবী, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযà...বিস্তারিত
মো.আরফান উদ্দীন : পৃথিবীর আর কোন দেশে বাংলাদেশের মতো প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় এত মানুষের প্রাণহানি ঘটে কি না, তা আমার...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : একটি মৃত্যুদণ্ডের খবর কখনো কখনো একটি পরিবারের শোকের সীমানা ছাড়িয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধকেই কাঠগà§...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল, জেলা ৩১৫-বি৪, বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগং কর্ণফুলী এল...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited