শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৮:৫৬ পিএম, ২০২৬-০৯-১৯
হাসপাতালের করিডোরে স্বজনের উৎকণ্ঠিত মুখ। কারও হাতে জ্বরের রিপোর্ট, কারও কোলে কাঁপতে থাকা শিশু। কোথাও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর জন্য শয্যা খোঁজা হচ্ছে, কোথাও হামের উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুকে ঘিরে ছুটছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। জ্বর যেন এখন আর কেবল একটি রোগের উপসর্গ নয়; এটি হয়ে উঠেছে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা, প্রস্তুতি ও জবাবদিহিরও পরীক্ষা।
বাংলাদেশে একই সময়ে ডেঙ্গু ও হামের বিস্তার সেই পরীক্ষাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ১৭ সেপ্টেম্বরের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ওই সময় পর্যন্ত ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৮ হাজার ৪০০ জন এবং মারা গেছেন ১৭৬ জন। শুধু আগের ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৪৮৪ জন; মারা গেছেন পাঁচজন।
হামের চিত্রও কম উদ্বেগের নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৫ মার্চ থেকে সন্দেহজনক হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৭২৫ জন। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৫৬ হাজার ৭১৮ জন। তাঁদের মধ্যে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৩৩ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। একই সময়ে নিশ্চিত হামে আক্রান্তের সংখ্যা ২০ হাজার ৩৯৫ এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০০ জনের। আর নিশ্চিত হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে মৃত্যুর সম্মিলিত সংখ্যা ১ হাজার ৪৮।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। ১ হাজার ৪৮ জনকে ‘নিশ্চিত হামে মৃত্যু’ বলা যাবে না। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা ১০০; বাকিগুলো হামসদৃশ উপসর্গে মৃত্যুর হিসাব। সংবাদ পরিবেশনে এই পার্থক্যটুকু না রাখলে আতঙ্ক বাড়তে পারে, কিন্তু বাস্তব চিত্র পরিষ্কার হয় না।
তবে পরিসংখ্যানের আরেকটি দিকও আছে। বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন—এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি সক্ষমতার ইঙ্গিত। কিন্তু একই সঙ্গে এত মৃত্যু আমাদের সামনে প্রশ্নও রাখছে। রোগীরা কি যথাসময়ে শনাক্ত হচ্ছেন? প্রাথমিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন? গুরুতর রোগীকে দ্রুত উন্নততর চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো যাচ্ছে? আর যেসব রোগী মারা যাচ্ছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণগুলো কি নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে?
কারণ শুধু হাসপাতালের শয্যা বাড়ালেই স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হয় না। প্রয়োজন চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ, প্রশিক্ষিত জনবল, জরুরি সেবা এবং দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থা—সবকিছুর সমন্বয়।
বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি। দেশের প্রান্তিক মানুষের জন্য এগুলোই স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রথম বড় আশ্রয়স্থল। অথচ জুন মাসে জাতীয় সংসদে দেওয়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ১৩ হাজার ২১১টি। এর মধ্যে কর্মরত ছিলেন ৭ হাজার ৪২৯ জন; অর্থাৎ ৫ হাজার ৭৮২টি পদ শূন্য। নার্সের ১৩ হাজার ৮০৯টি পদের মধ্যে ১২ হাজার ১৪৬টি পূরণ ছিল। অন্যান্য কর্মীর ৩ হাজার ১৮৬টি পদের মধ্যে কর্মরত ছিলেন ২ হাজার ১২০ জন।
এটি নিছক প্রশাসনিক হিসাব নয়। একজন ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে সময়মতো শারীরিক পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তরল ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকির লক্ষণ শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। হামের ক্ষেত্রে শিশুর শারীরিক অবস্থা, জটিলতা, পুষ্টিগত অবস্থা ও প্রয়োজনীয় সহায়ক চিকিৎসা দ্রুত নিশ্চিত করতে হয়। এসবের কোনো একটি স্তর দুর্বল হলে রোগীর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
আরও বড় প্রশ্ন হলো—যে জনবল আছে, তার সবাই কি নিয়মিত কর্মস্থলে থাকেন?
১৪ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী কয়েকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ডিজিটাল উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। ওই পর্যবেক্ষণে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অনুমতি ছাড়া কিছু চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীকে অনুপস্থিত পাওয়া যায়। পরে সংশ্লিষ্টদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জনবল সংকট যেমন বাস্তব, তেমনি কর্মরত জনবলের যথাযথ উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনও নিশ্চিত করা জরুরি। চিকিৎসক সংকটের কথা বলে যদি অনুমোদিত পদে থাকা চিকিৎসকও কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন, তাহলে সেই ঘাটতির দায় শুধু ব্যবস্থাপনার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। আবার দু-একজনের অনিয়মের উদাহরণ দিয়ে দেশের সব চিকিৎসককে দায়ী করাও ন্যায়সংগত নয়। বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী সীমিত জনবল নিয়ে প্রতিদিন দায়িত্ব পালন করছেন—এই বাস্তবতাটিও মনে রাখতে হবে।
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর সামগ্রিক চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের ৪১ হাজার ৮০৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৯ হাজার ৪০৭টি শূন্য। নার্সের ৪৯ হাজার ৫০১টি পদের মধ্যে শূন্য ৫ হাজার ৩২টি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ২৬ হাজার ৫৪৪টি পদের মধ্যে শূন্য ৮ হাজার ৭৮৪টি।
তাহলে চিকিৎসার সফলতা-ব্যর্থতার হিসাব কোথায়?
একটি হাসপাতালে রোগী ভর্তি হলো, চিকিৎসা পেল এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরল—এটি অবশ্যই সাফল্য। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন থাকবে, কতজন রোগী দেরিতে হাসপাতালে এসেছেন? কতজনের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হয়নি? কোথাও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা হয়নি কি না, ওষুধ বা জনবল সংকট ছিল কি না, গুরুতর রোগীকে রেফার করতে দেরি হয়েছে কি না—এসবও বিশ্লেষণ করতে হবে।
বিশেষ করে ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রম, বাসাবাড়ি ও নির্মাণস্থানে জমে থাকা পানি অপসারণ—এসব কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের কাজ নয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষ—সব পক্ষের দায়িত্ব আছে।
হামের ক্ষেত্রেও একই কথা আরও বেশি প্রযোজ্য। একটি শিশুকে হাসপাতালে এনে চিকিৎসা দেওয়ার চেয়ে তাকে আগেই টিকার আওতায় আনা অনেক বেশি কার্যকর। ফলে টিকাদান কর্মসূচির আওতা, বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের শনাক্তকরণ, টিকার সরবরাহ, মাঠপর্যায়ের নজরদারি এবং অভিভাবকদের সচেতনতা—সবকিছুর দিকে নজর দিতে হবে।
তাহলে দায়ী কে?
এই প্রশ্নের উত্তর একজন ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়ে শেষ করা যাবে না। রোগের বিস্তার ঠেকাতে ব্যর্থতার দায় একাধিক স্তরে ভাগ হয়ে থাকে। কোথাও মশক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাব দিতে হবে। কোথাও টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি থাকলে স্বাস্থ্য প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিত থাকলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। আর চিকিৎসায় গাফিলতির নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধেও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যাকেও আড়াল করা যাবে না। হাজার হাজার পদ শূন্য রেখে, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতি রেখে কেবল চিকিৎসকদের ওপর সব দায় চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। আবার অবকাঠামোর দুর্বলতার অজুহাতে ব্যক্তিগত দায়িত্বহীনতাকেও বৈধতা দেওয়া যায় না।
আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সম্ভবত আরও একটি হাসপাতাল নয়; বরং বিদ্যমান ব্যবস্থাকে কার্যকর করা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক থাকবেন, তিনি সময়মতো কর্মস্থলে থাকবেন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা হবে, ওষুধ থাকবে, গুরুতর রোগী দ্রুত জেলা বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছাবেন—এই ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পারলেই প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসার বড় একটি সংকট কমবে।
ডেঙ্গু ও হাম আমাদের সামনে সেই পুরোনো প্রশ্নটিই নতুন করে দাঁড় করিয়েছে—আমরা কি কেবল রোগের চিকিৎসা করছি, নাকি রোগীর জীবন বাঁচানোর মতো একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলছি?
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা শিশুটি এসব পরিসংখ্যান বোঝে না। তার পরিবারও বোঝে না কোন দপ্তরের কোন পদ শূন্য। তারা শুধু চায়—জ্বরের সময় চিকিৎসককে পাওয়া যাবে, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা হবে, ওষুধ মিলবে এবং বিপদে পড়লে তাকে দ্রুত বাঁচানোর ব্যবস্থা হবে। রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাফল্যের আসল মাপকাঠিও সেখানেই।
রোগী মারা যাওয়ার পর দায়ী খোঁজা নয়; রোগী যাতে সময়মতো সেবা পায়, রোগ যাতে আগেই প্রতিরোধ করা যায় এবং একটি মৃত্যুও যাতে অবহেলা, অনুপস্থিতি কিংবা সমন্বয়হীনতার কারণে না ঘটে—সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে জরুরি। ডেঙ্গু ও হাম তাই কেবল দুটি রোগের নাম নয়; এগুলো আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আয়না। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই—অব্যবস্থা, নাকি জবাবদিহিসম্পন্ন একটি কার্যকর চিকিৎসাব্যবস্থা—সিদ্ধান্ত এখন আমাদেরই।
লেখক: সাহিত্য ও মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ইতিহাসের প্রতিটি বড় মহামারি মানবসভ্যতাকে একই শিক্ষা দিয়েছে—মানুষ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ...বিস্তারিত
আলমগীর মানিক, রাঙামাটি : রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে নবনির্মিত ২৫০ শয্যা বিশি...বিস্তারিত
বোয়ালখালী প্রতিনিধি : : সারা দেশের মত বোয়ালখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারীরা প্রস্তাবিত ৬ দফা দাবি বাস্তবায়নে...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ আজ রবিবার ০১ জুন বিশ্ব দুগ্ধ দিবস ২০২৫। দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ বিশ্ব ডাইজেস্টিভ স্বাস্থ্য দিবস’ বা ‘বিশ্ব পরিপাক স্বাস্...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ আজ বুধবার ২৮ মে, বিশ্ব ব্লাড ক্যানসার দিবস ২০২৫।বিশ্ব ব্লাড ক...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited