শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৪:২০ পিএম, ২০২৬-০৯-১৯
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে একের পর এক তাঁত থেমে যাচ্ছে, কমছে উৎপাদন; সঙ্গে কমছে তাঁত শ্রমিকদের আয়। যে শ্রমিক সপ্তাহে ৫-৬ হাজার টাকা আয় করতেন, বিদ্যুৎ সংকটে তা নেমে এসেছে ২-৩ হাজারে। কোথাও আবার সাপ্তাহিক আয় কমে হয়েছে ১ থেকে দেড় হাজার টাকা। উৎপাদন কমে লোকসানের মুখে পড়ছেন তাঁত মালিকরাও। ফলে বিদ্যুৎ সংকট, সুতা-রঙের বাড়তি দাম ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ত্রিমুখী চাপে সংকটে পড়েছে পাবনা-সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প।
বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম বোর্ডের স্থানীয় বেসিক সেন্টারগুলোর তথ্যানুযায়ী, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ দেশের অন্যতম বৃহৎ তাঁত সমৃদ্ধ এলাকা। দুই জেলায় বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম ও চিত্তরঞ্জন তাঁতের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লাখ। এ অঞ্চলে উৎপাদিত শাড়ি ও লুঙ্গি দেশের বিপুল চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও বাজারে উৎপাদিত পণ্যের কাঙ্ক্ষিত দাম না থাকায় কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকেরা।
‘কখনো কখনো ২০-৪০ শতাংশ লোডশেডিংও থাকে। তবে বর্তমানে এই সমস্যা কম রয়েছে। প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের অসুবিধার বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানানো হয়েছে। সে অনুযায়ী সারাদেশে রেশনিং করে লোড ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তও হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হবে।’
কুষ্টিয়ার বাসিন্দা মো. টুটুল হোসেন। ২০ বছর ধরে তাঁত পেশার সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে পাবনা সদর উপজেলার দোগাছিতে রমজান আলীর তাঁত কারখানায় কাজ করছেন। তার মতে, তাঁত পেশায় অনেকদিন ধরে নানা সংকট থাকলেও এবারের মতো এত অসুবিধায় পড়েননি তাঁত সংশ্লিষ্টরা। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে কারখানায় উৎপাদন কমেছে, যেটির প্রভাব সরাসরি পড়েছে তাদের ওপর। আয় কমে অর্ধেকে নেমেছে। ওই নামমাত্র আয়ে সংসার চালানো দায়, বর্তমানে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে তার।
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, এমনিতেই তাঁত ও তাঁতিদের অবস্থা ভালো না। রঙ সুতাসহ বিভিন্ন জিনিসের দাম বৃদ্ধি। এদিকে কাপড়ের বাজার কমেছে। এরমধ্যে লোডশেডিংয়ের জ্বালা অসহ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলেছে।
টুটুল বলেন, এই কারখানায় ৬টি তাঁত, কাজ করি ৩ জন। ভোর ৬টা থেকে রাত ১০টা অবধি কাজ করি। বিদ্যুৎ স্বাভাবিক থাকতে সপ্তাহে একটি তাঁতে ১৩০-১৫০ পিছ লুঙ্গি বানানো যেতো। ৫-৬ হাজার টাকা আয় হতো। কিন্তু এখন কাজের নির্ধারিত সময়ে ৪-৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে ২-৩ হাজারের বেশি ইনকাম হচ্ছে না। লুঙ্গি বানানো যাচ্ছে সর্বোচ্চ ৮০ পিছ। এভাবে আমাদের সংসার চলছে না। খুব অসুবিধায় আছি। বাড়ি ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারছি না।
একই দুর্দশার কথা জানিয়েছেন সাঁথিয়ার তাঁত শ্রমিক আবুল হোসেন, রহম আলী ও মগরেব আলী। তারা জানান, আগে যেখানে দিনে ৩ থেকে ৪টি লুঙ্গির থান বোনা যেত, বিদ্যুৎ না থাকায় এখন সারা দিনে ২টি থান তৈরি করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে আগে যেখানে সপ্তাহে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা আয় হতো, তা এখন নেমে এসেছে ১ থেকে দেড় হাজার টাকায়। এ দুরবস্থা শুধু তাঁত শ্রমিকদের নয়। আরও প্রকট সমস্যায় রয়েছেন তাঁত মালকিরা। লোকসান ও দেনার দায়ে অনেকেই বন্ধ করছেন তাঁত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘন ঘন লোডশেডিং, সুতা ও রঙের অতিরিক্ত দাম এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ত্রিমুখী সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে পাবনা ও সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। লোকসানের মুখে বন্ধ হয়ে গেছে বহু বিদ্যুৎচালিত তাঁত (পাওয়ারলুম) ও চিত্তরঞ্জন (সেমি অটোমেটিক) তাঁত। এতে কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন দুই জেলার লাখো ক্ষুদ্র তাঁতি ও শ্রমিক। স্থানীয় তাঁতি সমিতিগুলোর তথ্য মতে, দুই জেলায় মোট সাড়ে চার লাখ তাঁতের মধ্যে প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ তাঁত মুখ থুবড়ে পড়েছে। কোনো কারখানা পুরোপুরি বন্ধ বা আবার কোনোটা অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। ‘তাঁতিদের চড়া দামে ডিজেল কিনে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না করলে এবং সরকারি নীতিগত সহায়তা না দিলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন এ ব্যবসায়ী নেতারা।’
সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিটি বিদ্যুৎচালিত তাঁতে সুতা তৈরি, রং করা, শুকানো, নলি ভরা ও কাপড় বোনার জন্য গড়ে ৩ থেকে ৪ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। সবমিলিয়ে এ খাতের ওপর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল।
বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম বোর্ড ও স্থানীয় তাঁতি সমিতি সূত্রে জানা গেছে, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের প্রায় ৫০ হাজার ছোট-বড় কারখানার ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভর করে অন্তত ১২ থেকে ১৫ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা। এর মধ্যে সুতা প্রসেসিং, রং করা, শুকানো, নলি ভরা ও কাপড় বোনার মতো কাজে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন প্রায় সাড়ে চার লাখ শ্রমিক। লোডশেডিং ও চলমান নানা সংকটে ইতোমধ্যে অর্ধেকেরও বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো চালু আছে, সেগুলোও লোডশেডিংয়ের কারণে দিনে মাত্র ৫-৬ ঘণ্টার বেশি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কাজের সুযোগ হারিয়ে বর্তমানে জেলা দুটির প্রায় পৌনে দুই লাখ তাঁতশ্রমিক সম্পূর্ণ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। পেশা বদলাচ্ছেন অনেকে। পাবনার দোগাছির হাসান, আবু জাফর ও কুলুনিয়া গ্রামের সৈয়দ আলীসহ কয়েকজন তাঁত মালিক জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর চালানো ছাড়া উপায় থাকে না। প্রতিদিন ৪-৫ ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে গিয়ে অতিরিক্ত প্রায় দেড় হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। একই গ্রামের সুতা ব্যবসায়ী কামাল ব্যাপারী ও ডায়িং মালিক দবির উদ্দিন বলেন, সুতা, রঙ, সোডা এসিডসহ সব উপকরণের দাম অনেক বেড়েছে। ৫০ কাউন্টের এক বেল সুতা এক বছর আগের ১৪ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ২০০ টাকায়। কাঁচামালের দামের বিপরীতে পণ্যের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ‘কারখানায় ৬টি তাঁত, কাজ করি ৩ জন। ভোর ৬টা থেকে রাত ১০টা অবধি কাজ করি। বিদ্যুৎ স্বাভাবিক থাকতে সপ্তাহে একটি তাঁতে ১৩০-১৫০ পিছ লুঙ্গি বানানো যেতো। ৫-৬ হাজার টাকা আয় হতো। কিন্তু এখন কাজের নির্ধারিত সময়ে ৪-৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে ২-৩ হাজারের বেশি ইনকাম হচ্ছে না। লুঙ্গি বানানো যাচ্ছে সর্বোচ্চ ৮০ পিছ। এভাবে আমাদের সংসার চলছে না। খুব অসুবিধায় আছি। বাড়ি ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারছি না।’ শাহজাদপুর হাটের পাইকারি বিক্রেতারা জানান, অতিরিক্ত উৎপাদন খরচের কারণে কাপড়ের দাম বেড়ে যাওয়া এবং আর্থিক মন্দার প্রভাবে বেচাকেনায় বড় ধস নেমেছে। রংপুর, ঢাকা বা চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা আগে প্রতি হাটে ৪ থেকে ৮ ট্রাক কাপড় কিনে নিয়ে যেতেন, তারা এখন মাত্র ১ থেকে ২ ট্রাক কাপড় কিনছেন। পাবনা ও সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এনায়েতপুর, শাহজাদপুর, বেলকুচি ও আতাইকুলা হাটে সপ্তাহে কয়েক শত কোটি টাকার লেনদেন হতো। দেশের নানা প্রান্তের পাশাপাশি ভারতীয় ব্যবসায়ীরাও এখান থেকে শাড়ি-লুঙ্গি কিনতেন। সপ্তাহে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার কাপড় কেনাবেচা ও ব্যাংক লেনদেন হতো। বর্তমানে তা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে বলে জানান স্থানীয় ব্যাংক ও ব্যবসায়ীরা। পাবনার বেড়া উপজেলা তাঁতি সমিতির সভাপতি আব্দুল গফুর জানান, তাঁতিদের চড়া দামে ডিজেল কিনে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না করলে এবং সরকারি নীতিগত সহায়তা না দিলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন এ ব্যবসায়ী নেতারা। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ২-এর জেনারেল ম্যানেজার আহমেদ শাহ আল জাবের বলেন, কখনো কখনো ২০-৪০ শতাংশ লোডশেডিংও থাকে। তবে বর্তমানে এই সমস্যা কম রয়েছে। প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের অসুবিধার বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানানো হয়েছে। সে অনুযায়ী সারাদেশে রেশনিং করে লোড ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তও হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হবে।
স্টাফ রিপোর্টার : : কয়েক হাজার শ্রমিক এক ফ্লোরে। সারি সারি টেবিলে উন্নত সব সেলাই মেশিন। নতুন কাপড়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে সে...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে একই দিনে একই বিষ...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : পদ্মা অয়েল পিএলসি.-এর ৫৬তম বার্ষিক সাধারণ সভা ৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে সকাল ১১:০০ টায় ডিজিটাল প্ল্যা...বিস্তারিত
খবর বিজ্ঞপ্তি : ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর শরী’আহ সুপারভাইজরি কাউন্সিলের এক সভা ৩০ নভেম্বর ২০২৫, রবিবার ই...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : দেশের জাহাজ নির্মাতা ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডে তৈরি ৩ জাহাজ রপ্তা...বিস্তারিত
স্টাফ রিপোর্টার : : দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে এক দিনে ৬ হাজার ৩০১টি গেটপাস ইস্যু হয়েছে। এটিকে রেকর্ড বলছেন চট্টগ্রা ...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited