চট্টগ্রাম   বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬  

শিরোনাম

নগর ব্যবস্থার ভাঙন: ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তার ও রাষ্ট্রীয় অচলাবস্থা

আবদুল্লাহ মজুমদার :    |    ০৬:৫০ পিএম, ২০২৬-০৫-১৩

নগর ব্যবস্থার ভাঙন: ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তার ও রাষ্ট্রীয় অচলাবস্থা

বাংলাদেশের শহর ও উপশহরের রাস্তায় এখন এক নতুন বাস্তবতার দৃশ্য স্পষ্ট—ব্যাটারিচালিত রিকশার নীরব গুঞ্জন আর অটোরিকশার অবিরাম চলাচল। একসময় যেগুলো ছিল বিকল্প পরিবহন, আজ সেগুলোই হয়ে উঠেছে দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই বিস্তারের আড়ালে লুকিয়ে আছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নগর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর এক জটিল সমীকরণ। সহজ চলাচলের এই বাহনগুলো একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলছে—আমাদের শহর কি প্রস্তুত ছিল এই পরিবর্তনের জন্য?

 ব্যাটারিচালিত রিকশা কেন দ্রুত বাড়ছে : 

ব্যাটারিচালিত রিকশা দ্রুত বিস্তার লাভ করার পেছনে রয়েছে গভীর কিছু অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা। স্বল্প পুঁজিতে এটি চালু করা যায় এবং দৈনিক নগদ আয় নিশ্চিত হওয়ায় নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য এটি দ্রুত আয়ের একটি সহজ পথ হয়ে উঠেছে।

এর পাশাপাশি জ্বালানি খরচ প্রায় নেই বললেই চলে—বিদ্যুৎ-নির্ভর এই যানবাহন পরিচালনায় ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে আয় ও ব্যয়ের অনুপাত একে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

নগর কাঠামোর ঘাটতিও এর বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছে। গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতা এবং “শেষ গন্তব্যে পৌঁছানোর” কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এই যানগুলো স্বাভাবিকভাবেই সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে। সহজ চালনা ব্যবস্থা এবং কম দক্ষতার প্রয়োজনীয়তাও এর জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে।

 সরকার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না কেন: 

এই খাতটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার বাইরে থেকে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করেছে। ফলে এটি এখন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির মাঝখানে অবস্থান করছে।

লাখো মানুষের জীবিকা এই খাতের সঙ্গে যুক্ত থাকায় হঠাৎ কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে অসংখ্য ছোট ও বিচ্ছিন্ন উৎপাদন ও পরিচালনা কাঠামো একক নিয়ন্ত্রণকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে।

আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো বিকল্প গণপরিবহন ব্যবস্থা এখনো পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে এই খাতকে হঠাৎ সরিয়ে দিলে পরিবহন সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

 ব্যাটারি রিকশা ও অটোরিকশার পার্থক্য: 

ব্যাটারিচালিত রিকশা মূলত বিদ্যুৎচালিত, স্বল্পগতির এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অননুমোদিতভাবে পরিচালিত একটি অনানুষ্ঠানিক পরিবহন ব্যবস্থা। এটি শহরের অলিগলি ও স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

অন্যদিকে, অটোরিকশা (CNG চালিত) তুলনামূলকভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন। এটি নির্দিষ্ট রুট, লাইসেন্স এবং জ্বালানি ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হওয়ায় পরিবহন ব্যবস্থার একটি কাঠামোবদ্ধ অংশ হিসেবে বিবেচিত।

এই দুইয়ের মৌলিক পার্থক্য তাই প্রযুক্তিগত নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ও নীতিগত কাঠামোর মধ্যে নিহিত।

 রাষ্ট্র ও জনগণের ওপর প্রভাব: 

রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রাজস্ব ক্ষতি। বিপুল সংখ্যক ব্যাটারিচালিত যানবাহন নিবন্ধনবিহীন হওয়ায় সরকার কর ও ফি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা অপ্রতুল হয়ে পড়ছে এবং নগর পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে।

অন্যদিকে, জনগণের ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো আরও সরাসরি। যানজট বৃদ্ধি, দুর্ঘটনার ঝুঁকি, যাত্রী নিরাপত্তার ঘাটতি এবং পরিবেশ দূষণ নগর জীবনের মানকে প্রভাবিত করছে। অনিয়ন্ত্রিত চালনা ব্যবস্থা এই সমস্যাকে আরও গভীর করছে।

 নীতিগত সমাধান: নিষেধ নয়, নিয়ন্ত্রণ: 

এই খাতকে হঠাৎ নিষিদ্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং প্রয়োজন ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রিত রূপান্তর।

প্রথমত, সব যানবাহনকে বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের আওতায় এনে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য নির্দিষ্ট চলাচল জোন নির্ধারণ করে প্রধান সড়কে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, চালকদের জন্য লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

চতুর্থত, ব্যাটারি ও যানবাহনের প্রযুক্তিগত মান ও নিরাপত্তা কাঠামো নির্ধারণ জরুরি।

পঞ্চমত, অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।

সবশেষে, গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত না করলে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশা এখন আর কেবল পরিবহন মাধ্যম নয়; এটি বাংলাদেশের নগর জীবনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একদিকে এটি সাধারণ মানুষের জীবিকার সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে নগর ব্যবস্থাপনায় সৃষ্টি করেছে নতুন চাপ ও চ্যালেঞ্জ। তাই সমাধান কোনো আকস্মিক নিষেধাজ্ঞায় নয়, বরং সুপরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণ, ধাপে ধাপে বৈধকরণ এবং বিকল্প গণপরিবহন শক্তিশালী করার মধ্যেই নিহিত। শহরের গতিশীলতা রক্ষা করতে হলে এই অনিয়ন্ত্রিত বাস্তবতাকে অস্বীকার নয়, বরং কাঠামোর ভেতরে এনে পরিচালিত করাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।

লেখক: নন্দিত সংগঠক ও সাহিত্যিক।

রিটেলেড নিউজ

বোর্ড চ্যালেঞ্জ: নম্বর কি সত্যিই ভবিষ্যৎ মাপে?

বোর্ড চ্যালেঞ্জ: নম্বর কি সত্যিই ভবিষ্যৎ মাপে?

আবদুল্লাহ মজুমদার : : ফল প্রকাশের পর মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠে কয়েকটি সংখ্যা। কারও জন্য সেই সংখ্যা আনন্দের, কারও জন্য হতা...বিস্তারিত


অভিযোগের ভারে নুয়ে পড়ছে আস্থা: পার্কভিউ হাসপাতালকে ঘিরে প্রশ্নের শেষ কোথায়?

অভিযোগের ভারে নুয়ে পড়ছে আস্থা: পার্কভিউ হাসপাতালকে ঘিরে প্রশ্নের শেষ কোথায়?

আবদুল্লাহ মজুমদার : : হাসপাতালের করিডোরে অপেক্ষমাণ স্বজনদের একটাই প্রার্থনা—প্রিয় মানুষটি যেন সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন। à...বিস্তারিত


 দৈনিক ‘আমাদের চট্টগ্রাম’-এর ১৫তম বর্ষপূর্তি ও গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত

দৈনিক ‘আমাদের চট্টগ্রাম’-এর ১৫তম বর্ষপূর্তি ও গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত

আমাদের ডেস্ক : : চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গণমাধ্যমকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বৈষমà§...বিস্তারিত


ত্রাণ বিতরণে নৈতিকতার প্রশ্ন

ত্রাণ বিতরণে নৈতিকতার প্রশ্ন

আবদুল্লাহ মজুমদার : : প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে যেমন প্রকাশ করে, তেমনি মানুষের মানবিকতা, রাষ্ট্à...বিস্তারিত


শূন্য থেকে বৈশ্বিক উচ্চতায় ‘এশিয়ান গ্রুপ’

শূন্য থেকে বৈশ্বিক উচ্চতায় ‘এশিয়ান গ্রুপ’

আ.ন.ম. তাজওয়ার আলম : বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ইতিহাসে তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প একটà...বিস্তারিত


সৈয়দ এনামুল তাজের জন্মদিনে

সৈয়দ এনামুল তাজের জন্মদিনে

আবদুল্লাহ মজুমদার : : বিধির পোশাকে তিনি শৃঙ্খলার প্রহরী এক দীপ্তিমান নাম, কাব্যের অলিন্দে জ্বালান তিনি মননের অনির্বাণ à...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

মন্ত্রণালয়ের আদেশ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিডিএ-তে শিকড় গেঁড়েছেন হারুন!

মন্ত্রণালয়ের আদেশ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিডিএ-তে শিকড় গেঁড়েছেন হারুন!

নিজস্ব প্রতিবেদক : ​সরকারি আদেশ মানেই যেন মগের মুল্লুক! গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট বদলি আদেশকে তোয়াক্কা নà¦...বিস্তারিত


নেশনস কাপের ফাইনালে মুখোমুখি সালাহ-মানে

নেশনস কাপের ফাইনালে মুখোমুখি সালাহ-মানে

স্পোর্টস ডেস্ক : : ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের জায়ান্ট লিভারপুলের জার্সিতে খেলেন দুজনেই। আক্রমণভাগে দুজনের রসায়নে অলরেড...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর