চট্টগ্রাম   বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬  

শিরোনাম

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই: লুটপাটের সংস্কৃতির অবসান ও জবাবদিহিতার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার

স্টাফ রিপোর্টার :    |    ০৭:০৯ পিএম, ২০২৬-০৮-১৩

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই: লুটপাটের সংস্কৃতির অবসান ও জবাবদিহিতার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার

এস.এফ.এম.মোস্তাঈন বিল্লাহ:

দুর্নীতি কেবল ঘুষের লেনদেনের নাম নয়; দুর্নীতি হলো রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা আদায়, স্বজনপ্রীতি, টেন্ডার কারসাজি, প্রকল্পের অর্থ লোপাট, নিয়োগ-বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক ক্ষমতাকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করার এক ভয়াবহ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাধি। এই ব্যাধি যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে শেকড় গেড়ে বসে, তখন উন্নয়নের দৃশ্যমান অবকাঠামোর আড়ালে জন্ম নেয় বৈষম্য, বঞ্চনা ও জনআস্থার গভীর সংকট।
দুর্নীতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এটি শুধু রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতিই করে না; ধীরে ধীরে মানুষের ন্যায়বিচার, আইন, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার ভিতও নড়বড়ে করে দেয়। একজন নাগরিক যখন বৈধ অধিকার পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য হন, একজন ঠিকাদার যখন কাজ পেতে অনৈতিক লেনদেনের আশ্রয় নেন, কিংবা কোনো প্রকল্পে বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না হয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থে চলে যায় তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ।

দুর্নীতির শিকড় যেখানে, দুর্নীতি সাধারণত একক কোনো ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে সুবিধাভোগী একটি সংঘবদ্ধ চক্র, যেখানে ক্ষমতা, অর্থ, প্রশাসনিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার অপব্যবহার ঘটতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই চক্র দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কাজ, উন্নয়ন প্রকল্প, সরবরাহ, নিয়োগ কিংবা বিভিন্ন সেবাখাতকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে।

এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে দুর্নীতি ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক নিয়মে’ পরিণত হয়। তখন সৎভাবে কাজ করতে চাওয়া মানুষও চাপে পড়ে এবং অসাধুদের দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকে। উন্নয়নের অর্থ লুটপাটের সুযোগ নয়
রাষ্ট্র জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়। জনগণের কর, রাজস্ব এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ থেকে যে অর্থ উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা হয়, সেটি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।

সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, প্রকল্পের কাজ অসম্পূর্ণ রেখে বিল উত্তোলন, কাগজে-কলমে কাজ দেখানো, অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো কিংবা প্রকল্পের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার মতো অনিয়ম উন্নয়নের গতি থামিয়ে দেয়। এর প্রত্যক্ষ শিকার হন সাধারণ মানুষ।
তাই প্রতিটি সরকারি প্রকল্পে বরাদ্দ কত, ব্যয় কত, কাজের অগ্রগতি কতটুকু এবং বাস্তবে জনগণ কী সুবিধা পাচ্ছে এসব তথ্য জনসম্মুখে থাকা জরুরি।

টেন্ডারবাজি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান:

দুর্নীতির অন্যতম আলোচিত ক্ষেত্র হলো সরকারি ক্রয় ও ঠিকাদারি ব্যবস্থা। প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হলে রাষ্ট্রীয় অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হয়।
যদি কোনো এলাকায় একই ধরনের ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বারবার সরকারি কাজের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ? প্রতিযোগিতা কতটা বাস্তব? জনগণের অর্থের সর্বোচ্চ মূল্য নিশ্চিত হচ্ছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন নথিভিত্তিক অনুসন্ধান, উন্মুক্ত তথ্য, স্বাধীন নজরদারি এবং কার্যকর জবাবদিহিতা।

প্রশাসনে ঘুষের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে:

একজন নাগরিকের বৈধ সেবা পাওয়ার জন্য ঘুষ দিতে হবে এমন সংস্কৃতি কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সরকারি সেবা জনগণের অধিকার; এটি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়। ঘুষের বিনিময়ে ফাইল নড়বে, সেবা মিলবে কিংবা সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হবে এই মানসিকতা ভাঙতে হলে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগকারী নাগরিক যাতে হয়রানি বা প্রতিশোধের শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

গণমাধ্যমের ভূমিকা: 

সত্য উন্মোচনের দায়িত্ব বার্তায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। সাংবাদিকের দায়িত্ব কারও বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ ছড়ানো নয়; বরং নথি, প্রত্যক্ষ তথ্য, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে জনস্বার্থের বিষয়গুলো সামনে আনা।

কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে সেই অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ কী, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী বলছে, অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য কী এবং তদন্তে কী পাওয়া গেছে সবকিছু গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে। কারণ সাংবাদিকতার শক্তি গুজবে নয়, সত্য ও প্রমাণে।

আইন সবার জন্য সমান হতে হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। ক্ষমতাবান ব্যক্তি অপরাধ করলে এক ধরনের বিচার আর সাধারণ মানুষ করলে অন্য ধরনের বিচার এমন দ্বৈতনীতি দুর্নীতিকে আরও উৎসাহিত করে।
দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত হতে হবে স্বাধীনভাবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে এবং প্রমাণ না থাকলে কাউকে সামাজিকভাবে অপরাধী বানানো থেকেও বিরত থাকতে হবে।

অভিযুক্ত হওয়া আর অপরাধী প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তাই দুর্নীতিবিরোধী লড়াই হতে হবে কঠোর, কিন্তু একই সঙ্গে ন্যায়সংগত ও প্রমাণনির্ভর। নীরবতা দুর্নীতিকে শক্তিশালী করে
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থান হলো নীরব থাকা। অনিয়ম দেখেও চুপ থাকা, ঘুষের লেনদেনকে মেনে নেওয়া কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধার বিনিময়ে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা দুর্নীতির বিস্তারকে পরোক্ষভাবে শক্তিশালী করে। তাই নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। অনিয়মের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো, সরকারি সম্পদের অপচয়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো সামনে আনা-এসবই দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধের অংশ। দরকার প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিপূজা নয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে টেকসই লড়াই কোনো একজন ব্যক্তির বীরত্বের ওপর নির্ভর করতে পারে না। প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ প্রশাসন, কার্যকর নজরদারি, স্বাধীন তদন্ত, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি।

একজন কর্মকর্তা বদলি হলে যদি দুর্নীতির পদ্ধতি বদলে না যায়, একজন জনপ্রতিনিধি পরিবর্তিত হলে যদি একই অনিয়ম অব্যাহত থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যা ব্যক্তিতে নয় সমস্যা কাঠামোগত। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু কয়েকজন দুর্নীতিবাজকে চিহ্নিত করা নয়; বরং দুর্নীতির যে কাঠামো অনিয়মকে জন্ম দেয়, সেই কাঠামো ভেঙে ফেলা।
 

রিটেলেড নিউজ

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চালু হলো সর্বাধুনিক প্রযুক্তির এআই নির্ভর 'অটো ফাইন সিস্টেম'

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চালু হলো সর্বাধুনিক প্রযুক্তির এআই নির্ভর 'অটো ফাইন সিস্টেম'

নিজস্ব প্রতিবেদক : হাইওয়ে পুলিশ সর্বাধুনিক এআই (Artificial Intelligence- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) প্রযুক্তির ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ চা...বিস্তারিত


আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের চট্টগ্রামের উদ্যোগে আজিমুশশান মিলাদুন্নবী (সা.) মাহফিল অনুষ্ঠিত

আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের চট্টগ্রামের উদ্যোগে আজিমুশশান মিলাদুন্নবী (সা.) মাহফিল অনুষ্ঠিত

স্টাফ রিপোর্টার : : "রাসুল (সা.)-এর সীরাত যত বেশি চর্চা হবে, আমাদের হৃদয় তত বেশি আলোকিত হবে। ইসলাম আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব ...বিস্তারিত


চট্টগ্রাম বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ঘিরে অপপ্রচার, সুষ্ঠু তদন্ত দাবি

চট্টগ্রাম বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ঘিরে অপপ্রচার, সুষ্ঠু তদন্ত দাবি

আমাদের ডেস্ক : : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে যাচাই-বাছাইহীন ও অসত্য তথ্যনির্ভ...বিস্তারিত


অকাল প্রয়াত দুইজন শিক্ষার্থীর স্মরণে চুয়েটে শোক সভা অনুষ্ঠিত

অকাল প্রয়াত দুইজন শিক্ষার্থীর স্মরণে চুয়েটে শোক সভা অনুষ্ঠিত

রাউজান প্রতিনিধি : : চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)—এর ২০২৪ ব্যাচের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ...বিস্তারিত


সৌদি আরবে সড়ক দূর্ঘটনায় রেমিট্যান্স যোদ্ধার মৃত্যু : পরিবারের শোক

সৌদি আরবে সড়ক দূর্ঘটনায় রেমিট্যান্স যোদ্ধার মৃত্যু : পরিবারের শোক

রাউজান প্রতিনিধি : : নিজের ফেসবুক একাউন্টের বায়ো ক্যাপশনে যখন লিখছিলেন, আমার মরণে যদি আপনার অশ্রু না গড়ায়, তবে আমার জন্...বিস্তারিত


 মেধা যেখানে নির্বাসিত, চাটুকারিতাই সেখানে ক্ষমতার প্রধান সিঁড়ি

 মেধা যেখানে নির্বাসিত, চাটুকারিতাই সেখানে ক্ষমতার প্রধান সিঁড়ি

আবদুল্লাহ মজুমদার : : কোনো এক সকালে অফিসের দরজা খুলে দেখা গেল—বছরের পর বছর নিষ্ঠা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করা মানুষ...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

নেশনস কাপের ফাইনালে মুখোমুখি সালাহ-মানে

নেশনস কাপের ফাইনালে মুখোমুখি সালাহ-মানে

স্পোর্টস ডেস্ক : : ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের জায়ান্ট লিভারপুলের জার্সিতে খেলেন দুজনেই। আক্রমণভাগে দুজনের রসায়নে অলরেড...বিস্তারিত


ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠানো নিয়ে পশ্চিমাদের আবারও রাশিয়ার হুশিয়ারি

ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠানো নিয়ে পশ্চিমাদের আবারও রাশিয়ার হুশিয়ারি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : : রাশিয়ার মাটিতে আঘাত হানতে পারে— এমন সব অস্ত্র ইউক্রেনকে সরবরাহ করার বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোকে হু...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর