শিরোনাম
রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি : | ০৫:৪৬ পিএম, ২০২৬-০৯-৩০
প্রাথমিক শিক্ষার শুরুতেই শিশুদের শেখানো হয় পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধির গুরুত্ব। অথচ রাঙ্গামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকার ৯৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনও নেই আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা। ১০ উপজেলার এসব বিদ্যালয়ে ওয়াশব্লক বা স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার না থাকায় প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে শত শত শিক্ষার্থী। দীর্ঘদিনের এই অব্যবস্থাপনা শুধু তাদের দৈনন্দিন শিক্ষা কার্যক্রমই ব্যাহত করছে না, তৈরি করছে শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ঝুঁকিও।
উপজেলাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাঙ্গামাটির বরকল, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি, বাঘাইছড়ি, রাজস্থলী, কাপ্তাই, কাউখালী, নানিয়ারচর, লংগদু এবং সদর উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি ও কাপ্তাই হ্রদ বেষ্টিত এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে ওয়াশব্লকের সংকট সবচেয়ে বেশি। বহু বিদ্যালয়ে বহু বছর আগে তৈরি করা অস্থায়ী কাঁচা শৌচাগার থাকলেও সেগুলো বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অনেক স্কুলে ছাত্র ও ছাত্রী উভয়ের জন্য রয়েছে মাত্র একটিমাত্র শৌচাগার, যা অপরিচ্ছন্ন এবং অস্বাস্থ্যকর।
এতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ছে কন্যাশিশুরা। স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ও পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা না থাকায় অনেক ছাত্রী মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে যা তাদের পড়াশোনায় পিছিয়ে দিচ্ছে এবং ঝরে পড়ার হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া বিশুদ্ধ পানির পর্যাপ্ত সংস্থান না থাকায় শৌচাগার ব্যবহারের পর সঠিকভাবে হাত ধোয়ার সুযোগ পায় না শিক্ষার্থীরা। ফলে সংক্রামক রোগব্যাধির প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ‘রাঙ্গামাটির ৯৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শৌচাগার না থাকার বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। দুর্গমতার কারণে কিছু কিছু এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন বিলম্বিত হচ্ছে। আমাদের মোট ৭০৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৯৪টি বিদ্যালয়ে ওয়াশব্লক নির্মাণের কাজ বাকি রয়েছে। তবে ‘চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪)’ এর মেয়াদ গত জুনে শেষ হয়েছে। এখন পিইডিপি-৫ এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এসব বিদ্যালয়ে ওয়াশব্লক নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দের চেষ্টা চলছে। বরাদ্দ পেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে শতভাগ বিদ্যালয়ে ওয়াশব্লক নির্মাণ সম্পন্ন করা হবে।’
সম্প্রতি রাঙ্গামাটি পৌর এলাকার ভেদভেদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছয় শতাধিক। নতুন একাডেমিক ভবন নির্মিত হলেও ওয়াশব্লক নির্মাণ করা হয়নি। ফলে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী ও ১২ জন শিক্ষক মিলে পুরানো ২টি শৌচাগার ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। পাশাপাশি অভিভকবকরাও এই শৌচাগার ব্যবহার করেন নিয়মিত।
বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তর থেকে বেশ কয়েকবার ওয়াশব্লক নির্মাণের কথা বলে জমির মাপ নিয়ে গেছেন। কিন্তু এখনো কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আমাদের শিক্ষার্থীরা পুরানো জরাজীর্ণ ২টি শৌচাগার ব্যবহার করে। যার মধ্যে একটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত। মূলত একটি শৌচাগার ৬৭৪ জন ছাত্র-ছাত্রীর জন্য একদমই পর্যাপ্ত না। দ্রুত নতুন শৌচাগার নির্মাণ করা খুবই জরুরি। এদিকে রাঙ্গামাটি পৌর এলাকার ১ নম্বর ওয়ার্ডের পুরানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভূমি সংকটের কারণে শৌচাগার নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানান প্রধান শিক্ষক হাসান উদ্দিন।
‘জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তর থেকে বেশ কয়েকবার ওয়াশব্লক নির্মাণের কথা বলে জমির মাপ নিয়ে গেছেন। কিন্তু এখনো কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আমাদের শিক্ষার্থীরা পুরানো জরাজীর্ণ ২টি শৌচাগার ব্যবহার করে। যার মধ্যে একটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত। মূলত একটি শৌচাগার ৬৭৪ জন ছাত্র-ছাত্রীর জন্য একদমই পর্যাপ্ত না। দ্রুত নতুন শৌচাগার নির্মাণ করা খুবই জরুরি।’
তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের জায়গা খুবই সীমিত। যেটুকু জায়গা খালি আছে সেটা অনেকটা পাহাড়ের খাঁদ। এখানে শৌচাগার নির্মাণ করতে হলে নির্ধারিত নকশার পরিবর্তন করতে হবে। এটা কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদার মানতে রাজি হচ্ছে না। ফলে নতুন শৌচাগার নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। পাহাড়ি এলাকার জায়গার ধরণ এবং যোগাযোগের দূর্গমতা কথা বিবেচনা করে শৌচাগার নকশা ও বরাদ্দের পরিমাণ বিবেচনা করতে হবে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনিরাপদ শৌচাগার ও পানির সংকট শিশুদের জন্য তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। নিয়মিত ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার না থাকায় শিশুরা নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নোংরা পরিবেশ এবং শৌচাগার ব্যবহারের পর হাত ধোয়ার ব্যবস্থা না থাকায় টাইফয়েড, জন্ডিস, ডায়রিয়া ও আমাশয়ের মতো পানিবাহিত রোগে ঘন ঘন আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। শৌচাগার ব্যবহার না করে দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব চেপে রাখার কারণে বিশেষ করে ছাত্রীরা মূত্রনালীর সংক্রমণে ভুগছে। কাঁচা বা অস্বাস্থ্যকর শৌচাগার ব্যবহারের কারণে কৃমির সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শিশুদের পুষ্টিহীনতা ও রক্তস্বল্পতার মূল কারণ।
রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) শওকত আকবর বলেন, শিশুদের শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে কম। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকলে সংক্রামক ব্যাধি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এটি শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং উপস্থিতির হারকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
‘শিশুদের শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে কম। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকলে সংক্রামক ব্যাধি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এটি শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং উপস্থিতির হারকে সরাসরি প্রভাবিত করে।’
বরাদ্দ কম থাকায় ৯৪টি বিদ্যালয়ে ওয়াশব্লক নির্মাণ সম্ভব হয়নি। তবে পাহাড়ি অঞ্চলে ওয়াশব্লক নির্মাণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে বলে জানান রাঙ্গামাটি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পরাগ বড়ুয়া।
তিনি বলেন, দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে অনেক পাহাড়ি এলাকার বিদ্যালয়ে মালামাল পরিবহনের সুব্যবস্থা নেই। হ্রদ পেরিয়ে কিংবা উঁচু পাহাড় ডিঙিয়ে নির্মাণসামগ্রী পৌঁছাতে খরচ নির্ধারিত বাজেটের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। পাহাড়ি এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নিচে নেমে যায়। রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং বা গভীর নলকূপ স্থাপনের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে শৌচাগার থাকলেও তা অকার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। দুর্গমতা ও পরিবহন খরচের কারণে অনেক সময় দরপত্র আহ্বানের পরও ঠিকাদাররা পাহাড়ি এলাকায় শৌচাগার নির্মাণের কাজ নিতে আগ্রহ দেখান না।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও স্থানীয় অভিভাবকরা এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বাঘাইছড়ির এক দুর্গম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে ১০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে, কিন্তু ভালো কোনো শৌচাগার নেই। পাশের ছড়া বা ঝোপঝাড়ে যেতে হয় শিশুদের। বর্ষাকালে এই ঝুঁকি আরও বাড়ে। আমরা বারবার উপজেলা শিক্ষা অফিসে আবেদন করেছি, কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি। রাঙ্গামাটি শহরের বাসিন্দা অভিভাবক উজ্জ্বল চাকমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ আর উন্নয়নের কথা বলা হলেও আমাদের শিশুদের ন্যূনতম শৌচাগার সুবিধাটুকু দেওয়া যাচ্ছে না। জেলা শহরের অনেক স্কুলে শৌচাগার নেই- এটা কি করে সম্ভব। যেগুলো আছে তাও অপরিচ্ছন্ন, অস্বাস্থ্যকর। আমরা বাধ্য হয়ে অসুস্থতার ভয়ে অনেক সময় সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাই।
রাঙ্গামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কফিল উদ্দিন বলেন, রাঙ্গামাটির ৯৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শৌচাগার না থাকার বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। দুর্গমতার কারণে কিছু কিছু এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন বিলম্বিত হচ্ছে। আমাদের মোট ৭০৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৯৪টি বিদ্যালয়ে ওয়াশব্লক নির্মাণের কাজ বাকি রয়েছে। তবে ‘চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪)’ এর মেয়াদ গত জুনে শেষ হয়েছে। এখন পিইডিপি-৫ এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এসব বিদ্যালয়ে ওয়াশব্লক নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দের চেষ্টা চলছে। বরাদ্দ পেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে শতভাগ বিদ্যালয়ে ওয়াশব্লক নির্মাণ সম্পন্ন করা হবে।
পার্বত্য অঞ্চলের শিশুদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। ৯৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই শৌচাগার সংকট দ্রুত নিরসন না হলে পাহাড়ি অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং শিশু স্বাস্থ্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করবে-এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।
খবর বিজ্ঞপ্তি : আনোয়ারা-কর্ণফুলী বর্তমানে চট্টগ্রামের দ্রুত পরিবর্তনশীল অঞ্চল সমূহের মধ্যে অন্যতম। পরিকল্পিত উ...বিস্তারিত
স্টাফ রিপোর্টার : : কক্সবাজারের টেকনাফ পাহাড়ি অঞ্চল অপহরণকারী ও ডাকাত দলের অভয়ারণ্য পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আ...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দরে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়েছে...বিস্তারিত
রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি : : পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে চরম জনবল সংকট। জেলার ১০ উপজেলায় ...বিস্তারিত
আলমগীর মানিক, রাঙামাটি : রাঙামাটি সদর উপজেলার মানিকছড়ি এলাকায় অনুমোদন ছাড়াই পাহাড় কেটে চলাচলের রাস্তা তৈরির অভিযোগে এনফোà...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রামে পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে বাসায় ফেরার পথে ‘দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম’-এর সহ-সম্পাদক ও স...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited