শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০২:৩৬ পিএম, ২০২৬-১১-০১
সকালের আলো ফুটতেই সরব হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ। পণ্য ওঠানামা করে, চলে দরদাম, খাতায়-কলমে হিসাব মেলে, হাতবদল হয় লেনদেনের নথি। এই কর্মচঞ্চলতার মধ্যেই নির্ধারিত হয় বহু পণ্যের বাণিজ্যিক গতিপথ। কিন্তু লেনদেনের কাগজে যে হিসাব লেখা থাকে, বাস্তবেও কি তার প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ? পণ্য মজুতের তথ্য, সরবরাহের হিসাব কিংবা ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) স্লিপের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার জবাব কে দেবে? খাতুনগঞ্জের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এই প্রশ্নগুলোকে সামনে এনেছে। কারণ, বাজারের আস্থা শুধু পণ্যের প্রাচুর্য কিংবা বেচাকেনার গতি দিয়ে তৈরি হয় না; এর ভিত্তি হলো নির্ভরযোগ্য হিসাব, সুশৃঙ্খল লেনদেন ও কার্যকর জবাবদিহি।
ডিও স্লিপ পাইকারি বাণিজ্যের একটি প্রচলিত লেনদেনের নথি। এর মাধ্যমে পণ্য বুঝে নেওয়া, সরবরাহের অধিকার নির্ধারণ এবং লেনদেনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়। কিন্তু স্লিপে প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, অনুমোদিত ব্যক্তির স্বাক্ষর, পণ্যের পরিমাণ কিংবা সংশ্লিষ্ট চালানের তথ্য যথাযথভাবে উল্লেখ না থাকলে বিরোধ দেখা দিলে দায় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। স্লিপের বিপরীতে পণ্য বাস্তবে মজুত আছে কি না, অর্থ পরিশোধ হয়েছে কি না এবং ক্রেতা নির্ধারিত পণ্য বুঝে পেয়েছেন কি না—এসব তথ্যও যাচাইযোগ্য হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় কাগজে লেনদেনের হিসাব থাকলেও বাস্তব সরবরাহের চিত্র অস্পষ্ট থেকে যেতে পারে।
খাতুনগঞ্জে ডিও স্লিপের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত সংবাদে কিছু স্লিপে প্রতিষ্ঠানের নাম, সিল বা স্বাক্ষরের ঘাটতির বিষয়টি উঠে আসে। ২০২৬ সালের মে মাসেও খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এসব ঘটনা লেনদেনব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনে। তবে ডিও স্লিপের ব্যবহারমাত্রই অনিয়ম নয়। কোনো স্লিপের অপব্যবহার হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে সংশ্লিষ্ট নথি, পণ্যের মজুত, অর্থ পরিশোধ ও সরবরাহের তথ্য যাচাই করে। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করা যেমন অনুচিত, তেমনি অভিযোগের গুরুত্ব উপেক্ষা করাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।
সোনামিয়া মার্কেটের নূর ট্রেডিংকে ঘিরে ব্যবসায়ীদের পাওনা নিয়ে অতীতেও বড় অঙ্কের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ১০ জুন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর এক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির মালিক নাজিম উদ্দিনের কাছে ব্যবসায়ীদের প্রায় ৫০ কোটি টাকা পাওনা থাকার অভিযোগ উঠে আসে। এ অভিযোগের বর্তমান নিষ্পত্তি বা চূড়ান্ত আইনি অবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য হালনাগাদ তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি। তাই বিষয়টিকে প্রমাণিত আত্মসাৎ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। তবে এত বড় অঙ্কের পাওনা নিয়ে বিরোধের অভিযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: বড় বাণিজ্যিক লেনদেনে পণ্য, অর্থ ও দায় নির্ধারণের স্বচ্ছ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? ব্যবসায়িক আস্থা কেবল পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করতে পারে না; এর সঙ্গে থাকতে হবে যাচাইযোগ্য নথি, স্পষ্ট দায়বদ্ধতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা।
এ প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বেড়েছে এলাচের মূল্যবৃদ্ধি ও মজুত নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায়। ২০২৬ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে এলাচের কেজিপ্রতি দাম ৩ হাজার ৫৮০ টাকা থেকে ৪ হাজার ৩৪৫ টাকায় ওঠার তথ্য এসেছে। অন্য একটি প্রতিবেদনে দাম ৪ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনগুলোর সময়কাল ও দামের ভিত্তি এক নয়; তাই এগুলোকে একই ধারাবাহিক পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে আমদানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজার, বিনিময় হার, শুল্ক, পরিবহন খরচ ও সরবরাহের পরিস্থিতিসহ একাধিক কারণ থাকতে পারে। ফলে শুধু মূল্যবৃদ্ধি দেখেই মজুতদারি বা কারসাজির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। তবে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ উঠলে বাজারে পণ্যের প্রকৃত প্রাপ্যতা ও মজুতের হিসাব যাচাই করা জরুরি।
১৩ অক্টোবর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সাত ব্যবসায়ীর দুটি গুদামে প্রায় ৫০০ টন এলাচ মজুত থাকার অভিযোগ করা হয়। তবে এই পরিমাণ মজুতের বিষয়ে স্বাধীন সরকারি নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ১৫ অক্টোবরের অভিযানের বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন গুদামে ১৬০ থেকে ১৭০ টন এলাচ মজুত পাওয়ার তথ্য উঠে আসে। অভিযানে হোসাইন করপোরেশনকে এলাচের মজুতসংক্রান্ত বিষয়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করার খবর প্রকাশিত হয়। আরাফাত ট্রেডিংকে মূল বস্তায় উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ না থাকার কারণে জিরা সংরক্ষণের বিষয়ে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ১১ মাস আগে কেনা ১৫ টন এলাচের মধ্যে ১৪ দশমিক ৫ টন অবশিষ্ট থাকার তথ্য এবং প্রাইম ট্রেডিংয়ের ৪৭ টন এলাচের মজুত ও সরবরাহের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
তবে এসব তথ্যের ব্যাখ্যায় সতর্কতা জরুরি। দুটি গুদামে ৫০০ টন এলাচ মজুতের অভিযোগ এবং অভিযানে ১৬০ থেকে ১৭০ টন এলাচ পাওয়ার তথ্য একই পরিসরের কি না, তা নিশ্চিত নয়। একইভাবে, বিপুল পরিমাণ পণ্য মজুত থাকা কিংবা দীর্ঘদিন ধরে পণ্য অবশিষ্ট থাকাই অবৈধ মজুত বা বাজার কারসাজির চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। পণ্য আমদানির সময়, ক্রয়মূল্য, বিক্রির হিসাব, বাজারে সরবরাহ, মজুতের মেয়াদ এবং প্রযোজ্য আইন পর্যালোচনা করে তবেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। একই সঙ্গে অভিযানের পর তদন্তের ফল, অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং গৃহীত ব্যবস্থার তথ্যও প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে প্রকৃত অনিয়ম শনাক্ত হবে, আর বৈধ ব্যবসায়ীরা অযথা সন্দেহের মুখে পড়বেন না।
এখানেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে কত পণ্য রয়েছে, কতটুকু বিক্রি হয়েছে এবং ক্রেতার কাছে কতটুকু সরবরাহ করা হয়েছে—এসব তথ্য যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। ডিও স্লিপের বিপরীতে পণ্যের অস্তিত্ব ও সরবরাহের হিসাব না মিলিয়ে শুধু কাগজপত্রের ওপর নির্ভর করলে অনিয়ম শনাক্ত করা কঠিন। তাই প্রতিটি স্লিপে প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ পরিচয়, অনুমোদিত ব্যক্তির স্বাক্ষর, পণ্যের পরিমাণ, লেনদেনের তারিখ এবং সংশ্লিষ্ট চালান বা গুদামের তথ্য থাকা প্রয়োজন। স্লিপ হস্তান্তর, অর্থ পরিশোধ ও পণ্য সরবরাহের প্রতিটি ধাপের নথি সংরক্ষণ করতে হবে। প্রয়োজনে ডিজিটাল নিবন্ধন ও যাচাইব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যাতে কোনো বিরোধ দেখা দিলে দ্রুত লেনদেনের ধারাবাহিকতা যাচাই করা সম্ভব হয়।
ব্যবসায়ী সমিতি, বাজার কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ও জোরদার করা দরকার। অভিযোগ উঠলেই অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়; অভিযোগের ভিত্তি যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ, নথিপত্র পরীক্ষা এবং তদন্তের ফল প্রকাশ করাও জরুরি। নিয়ম মেনে আমদানি ও মজুত করা ব্যবসায়ী যেন হয়রানির শিকার না হন, আবার প্রমাণিত অনিয়মের ক্ষেত্রেও যেন পরিচয় বা প্রভাবের কারণে কেউ ছাড় না পান। বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে ব্যবসায়ীরা তাঁদের অধিকার সম্পর্কে নিশ্চিত থাকবেন এবং ক্রেতারা পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাবেন।
খাতুনগঞ্জের ব্যস্ততা থেমে থাকবে না। প্রতিদিনের মতো পণ্য আসবে, বেচাকেনা চলবে, হিসাবের খাতায় যোগ হবে নতুন অঙ্ক। কিন্তু বাণিজ্যের এই প্রবাহের সঙ্গে যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকে, তাহলে বাজারের আস্থায় ফাটল ধরবে; আর সেই ক্ষতির প্রভাব ব্যবসার গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়তে পারে। তাই সোনামিয়া মার্কেটের পাওনা নিয়ে অভিযোগ হোক, ডিও স্লিপের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন হোক কিংবা এলাচের মজুত ও মূল্যবৃদ্ধি—প্রতিটি বিষয়েই প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক তদন্ত ও ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত। অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য ধরে কাউকে দোষী করা যাবে না, আবার প্রমাণের মুখোমুখি না করে কোনো অভিযোগকে চাপা দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। খাতুনগঞ্জের বাণিজ্যিক সুনাম রক্ষার পথ একটাই—লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, পণ্যের প্রকৃত হিসাব প্রকাশ করা এবং প্রমাণিত অনিয়মের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক।
আবদুল্লাহ মজুমদার : : মাসের শেষ দিকে সংসারের খরচ মেলাতে গিয়ে অনেক সরকারি কর্মচারীকেই হিমশিম খেতে হয়। বাড়িভাড়া, সন্তানদà§...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের পুরোনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনà¦...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : চট্টগ্রাম নগরীর রাস্তায় প্রতিদিনের যানজট, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, বর্জ্যের স্তূপ আর নাগরিক দুর্ভোগের ম...বিস্তারিত
রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি : : রাঙামাটিতে কোতয়ালী থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে মাদক কারবারি, মাদকসেবী, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযà...বিস্তারিত
মো.আরফান উদ্দীন : পৃথিবীর আর কোন দেশে বাংলাদেশের মতো প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় এত মানুষের প্রাণহানি ঘটে কি না, তা আমার...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : একটি মৃত্যুদণ্ডের খবর কখনো কখনো একটি পরিবারের শোকের সীমানা ছাড়িয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধকেই কাঠগà§...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited