শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৬:৪৬ পিএম, ২০২৬-০৬-৩০
একসময় সবুজ পাহাড়ে ঘেরা চট্টগ্রাম ছিল দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নগরী। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দখলদারিত্বের চাপে সেই পাহাড়গুলো আজ অস্তিত্ব সংকটে।
যে পাহাড় একসময় নগরীকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা দিত, সেই পাহাড়ই এখন বর্ষা এলেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা, স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ এবং চট্টগ্রাম মহানগরের মাস্টার প্ল্যানের তথ্য বলছে- পাহাড় ধ্বংসের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম আরও বড় পরিবেশগত ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে।
চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে গত দুই দশকে আবাসন নির্মাণ, অবৈধ দখল এবং প্রভাবশালী মহলের বাণিজ্যিক স্বার্থে পাহাড় কাটার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এর ফলে শুধু পাহাড়ের আয়তনই কমছে না, বরং পরিবর্তিত হচ্ছে ভূমির স্বাভাবিক গঠন, বাড়ছে ভূমিধসের ঝুঁকি এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (এসইউএসটি) পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষক মো. শফিকুল ইসলাম ও তাঁর দল ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে 'ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ (আইজেএসইআর)'-এ ‘ল্যান্ডস্লাইড প্রবলেম ইন লালখান বাজার এরিয়া অব দ্য চিটাগং সিটি, বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রকাশ করেন।
গবেষণায় দেখা যায়, লালখান বাজার, মতিঝর্না ও বাটালি হিল এলাকার পাহাড়গুলোর উপরের স্তর শক্ত মাটি দিয়ে গঠিত হলেও নিচের স্তরে রয়েছে আলগা বালুর স্তর। কিন্তু বসতি ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য এসব পাহাড় ৭০ থেকে ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত খাড়া কোণে কেটে ফেলা হচ্ছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে প্রবেশ করে নিচের আলগা স্তরে চাপ সৃষ্টি করে। এতে মাটির অভ্যন্তরীণ সংযোজন শক্তি (কোহেশন) ১.৫৩ থেকে ৩.৫ কিলোপ্যাসকেল (কেপিএ) এ নেমে আসে। ফলে বাইরে থেকে স্থিতিশীল মনে হলেও ভারী বৃষ্টির সময় এসব পাহাড় মুহূর্তেই ধসে পড়তে পারে।
সংকুচিত হচ্ছে পাহাড়ের আয়তন
চট্টগ্রাম মহানগরের চিটাগং মেট্রোপলিটন মাস্টার প্ল্যান (সিএমএমপি) এবং সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে পাহাড়ের বর্তমান অবস্থার একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
সিডিএর মাস্টার প্ল্যানের তথ্যানযায়ী, চট্টগ্রামের মোট পাহাড়ি এলাকার আয়তন প্রায় ৪৮ হাজার ১৭৮ দশমিক ২৪ একর। এর মধ্যে চিটাগং সিটি করপোরেশন (সিসিসি) এলাকায় রয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৯৮৫ দশমিক ৩০ একর পাহাড়।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ১১ থেকে ২৫ মিটার উচ্চতার নিচু পাহাড়গুলো। বর্তমানে প্রায় ২৪ হাজার ৯৩০ দশমিক ৮০ একর এলাকা জুড়ে থাকা এসব পাহাড়ই সবচেয়ে বেশি কাটার শিকার হচ্ছে।
বদলে যাচ্ছে পাহাড়ের প্রাকৃতিক রূপ
চীনের বেইজিং ফরেস্ট্রি ইউনিভার্সিটির গবেষক মাশেলি চাকমা ও তাঁর দল ২০২৩ সালে ‘সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বিশ্বখ্যাত ওপেন-অ্যাক্সেস প্রকাশনা সংস্থা এমডিপিআই (মাল্টিডিসিপ্লিনারি ডিজিটাল পাবলিশিং ইনস্টিটিউট) জার্নালে ‘অ্যান অ্যাসেসমেন্ট অব ল্যান্ডস্কেপ অ্যান্ড ল্যান্ড ইউজ/কভার চেঞ্জ অ্যান্ড ইটস ইমপ্লিকেশনস ফর সাসটেইনেবল ল্যান্ডস্কেপ ম্যানেজমেন্ট ইন দ্য চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস, বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রকাশ করেন।
এতে ১৯৯৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২০ বছরের স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণে গবেষকরা দেখিয়েছেন, বন উজাড়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনের কারণে পাহাড়ি ল্যান্ডস্কেপ দিন দিন আরও বেশি খণ্ডিত (ফ্র্যাগমেন্টেড) হয়ে যাচ্ছে। তাঁদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪৮ সালের মধ্যে পাহাড়ি অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশ্লেষণেও একই সতর্কবার্তা
২০২৫ সালের নভেম্বরে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের গবেষক মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ও তাঁর দল গবেষণা সংস্থা ‘স্প্রিঞ্জার ন্যাচার’ কর্তৃক প্রকাশিত 'ডিসকভার সাসটেইনেবিলিটি' জার্নালে ‘রিমোট সেন্সিং অ্যান্ড জিআইএস-ড্রিভেন ল্যান্ডস্লাইড সাসসেপ্টিবিলিটি ম্যাপিং ইউজিং মেশিন লার্নিং ফর সাসটেইনেবল ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট: আ স্টাডি ফ্রম দ্য চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রকাশ করেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রিমোট সেন্সিং, জিআইএস এবং মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকরা দেখিয়েছেন, চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকার ৭৮ থেকে ৭৯.১২ শতাংশ এখন উচ্চ থেকে অতি উচ্চ ভূমিধস ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
একই বছরে বুয়েট এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সুজিত কুমার রায় ও তাঁর দল 'ডিসকভার জিওসায়েন্স' জার্নালে "ল্যান্ডস্লাইড সাসসেপ্টিবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট ইন চিটাগং ডিভিশন ইউজিং রিমোট সেন্সিং, জিআইএস অ্যান্ড মেশিন লার্নিং" শীর্ষক গবেষণায় দেখিয়েছেন, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ের উচ্চতা এবং ভূমির ঢালের পরিবর্তনই বর্তমানে ভূমিধসের সবচেয়ে বড় নিয়ামক।
কেন থামছে না পাহাড় কাটা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রাম থেকে শহরে মানুষের অভিবাসন, সাশ্রয়ী আবাসনের সংকট এবং পাহাড়ের পাদদেশে অনিয়ন্ত্রিত বসতি গড়ে ওঠা একটি বাস্তবতা। তবে গবেষণাগুলোতে সবচেয়ে বড় দায় হিসেবে উঠে এসেছে প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের অবৈধ পাহাড় কাটার কার্যক্রম। তাই শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. ইকবাল সরওয়ার বাংলানিউজকে বলেন, চট্টগ্রামের পাহাড় নগরের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। পাহাড় কাটা হলে শুধু ভূমিধস নয়, জলাবদ্ধতা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই পাহাড়ে অবৈধ বসতি স্হাপন নিষিদ্ধ করে পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
একই বিভাগের আরেক অধ্যাপক ড. শহিদুল ইসলাম বলেন, শুধু অভিযান পরিচালনা করে পাহাড় রক্ষা সম্ভব নয়। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ পুনর্বাসন, সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা এবং পাহাড় ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতের চট্টগ্রামকে আরও ভয়াবহ পাহাড়ধস, পরিবেশ ধ্বংস এবং মানবিক বিপর্যয়ের মূল্য দিতে হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক : শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জেদ্দা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক যাত্রীর কাছ থেকà...বিস্তারিত
চবি প্রতিনিধি : : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তà¦...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) সংশোধন আইন ২০২৬ এর ৪ ধারা অনুযায়ী চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পূর্à...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার, সিএমপির উদ্যোগে তিনদিন মেয়াদি ওয়াচার কনস্টেবলদের ‘দক্ষতা উন্নয়ন কো...বিস্তারিত
স্টাফ রিপোর্টার : : আহমদ উল্লাহ : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কোনো প্রার্থী ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থ বা ইচ্ছার ভিত্তিতে...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : আবদুল্লাহ মজুমদার : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, মাওলানা মোহাম্মদ মনি...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited