শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৭:৫৭ পিএম, ২০২৬-১০-০৪
রবিউল আউয়াল আসে, রবিউল আউয়াল যায়। ক্যালেন্ডারের পাতায় মাসটি একসময় শেষও হয়ে যায়। কিন্তু কোথাও কোথাও মনে হয়, মিলাদুন্নবীর আয়োজন আর শেষ হতে চায় না! একদিকে মাইকে মিলাদ ও আলোচনা, অন্যদিকে সিরাতুন্নবীর অনুষ্ঠান; আজ এক কমিটির আয়োজন, কাল আরেক কমিটির। তার সঙ্গে আছে রসিদ—চাঁদার রসিদ। এক আয়োজন শেষ হওয়ার আগেই আরেক আয়োজনের জন্য চাঁদার ডাক। আর কখনো কখনো এমন কথাও কানে আসে—চাঁদা না দিলে বিরানিও বাসায় পৌঁছাবে না! অর্থাৎ, টাকা দিলেই মিলবে বিরানি। তখন প্রশ্নটা শুধু চাঁদার থাকে না; প্রশ্নটা গিয়ে ঠেকে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং স্বতঃস্ফূর্ততার জায়গায়।
ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে ধর্মীয় আয়োজন হবে—এতে আপত্তির কোনো কারণ নেই। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, আদর্শ ও মানবিক শিক্ষা নিয়ে আলোচনা, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিরই বহিঃপ্রকাশ। মানুষ নিজের বিশ্বাস, সামর্থ্য ও আগ্রহ অনুযায়ী এসব আয়োজনে অংশ নেবেন—এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন স্বেচ্ছার জায়গায় সামাজিক চাপ এসে দাঁড়ায়।
আমার নিজের এলাকার অভিজ্ঞতাই বলি। আমার এলাকায় ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে একাধিক আয়োজন হয়েছে। একটি আয়োজনের নেতৃত্বে ছিলেন বিএনপির ওয়ার্ড সভাপতি নবাব খান। আরেকটি আয়োজন হয়েছে গাউসিয়া কমিটির উদ্যোগে। এর বাইরে এলাকার আরেকটি মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছেন আমার তাল্ত নাসির।
একাধিক আয়োজন হওয়ায় আমার আপত্তি নেই। যার যার বিশ্বাস ও সামর্থ্য অনুযায়ী ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করতেই পারেন। কিন্তু একই এলাকার মানুষকে যখন একের পর এক আয়োজনের জন্য চাঁদা দিতে হয়, তখন বিষয়টি আর শুধু ধর্মীয় আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশেষ করে পরিচিত মানুষ, আত্মীয়স্বজন, দোকানদার, ব্যবসায়ী কিংবা দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের কাছে বারবার চাঁদা চাওয়া হলে অনেকেই হয়তো ‘না’ বলতে অস্বস্তি বোধ করেন।
তাল্ত নাসিরের নেতৃত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমাকে শরিক হওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের মানসিক চাপ অনুভব করতে হয়েছিল। আমিও শেষ পর্যন্ত সামান্য অংশগ্রহণ করেছিলাম। পরে আমাকে জানানো হলো, আমার দেওয়া অর্থের পরিমাণ যথেষ্ট নয়; আরও বেশি টাকা দিতে হবে। শেষ পর্যন্ত আমার দেওয়া টাকা ফেরত দেওয়া হয়।
এটি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কোনো ব্যক্তি বা আয়োজকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা আমার উদ্দেশ্য নয়। বরং এই অভিজ্ঞতা আমাকে একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে—কোনো ধর্মীয় আয়োজনে অর্থ দেওয়া কি সত্যিই স্বেচ্ছার বিষয়, নাকি সামাজিক সম্পর্ক ও পরিচয়ের কারণে মানুষ অনেক সময় দিতে বাধ্য বোধ করেন?
প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন একটি এলাকায় একাধিক কমিটি একই সময়ে একই মানুষের কাছে চাঁদা সংগ্রহ করে। একদিকে মিলাদুন্নবী, অন্যদিকে সিরাতুন্নবী। কোথাও আলোচনা সভা, কোথাও দোয়া মাহফিল। প্রতিটি আয়োজনের জন্য আলাদা কমিটি, আলাদা রসিদ, আলাদা সংগ্রহ।
একজন সাধারণ দোকানদারকে ভাবুন। দিনের পর দিন দোকানে বসে ব্যবসা করছেন। এক কমিটি এল, চাঁদা দিলেন। কিছুদিন পর আরেক কমিটি এল, আবার চাঁদা দিলেন। এরপর পরিচিত কেউ এসে বললেন, ‘আমাদের অনুষ্ঠানটাও আছে।’ এবার কী করবেন? না বললে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়, দিলে নিজের ব্যবসার হিসাবের ওপর চাপ।
একই অবস্থা সীমিত আয়ের চাকরিজীবী কিংবা দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের ক্ষেত্রেও হতে পারে। বিশেষ করে পুরোনো বাসিন্দাদের কাছে অনেক সময় চাঁদার রসিদ পৌঁছে যায় তারা নিজে কিছু বলার আগেই। রসিদটি হয়তো অনুদানের একটি সাধারণ আহ্বান। কিন্তু সামাজিক বাস্তবতায় সেটি কখনো কখনো এমন এক নীরব বার্তা বহন করে—‘আপনাকে তো দিতেই হবে।’
আর এখানেই স্বেচ্ছা আর সামাজিক চাপের পার্থক্য।
কেউ নিজের ইচ্ছায়, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দিলেন—এটি অনুদান। কিন্তু সম্পর্ক, পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার প্রত্যাশার কারণে অর্থ দিতে বাধ্য বোধ করলেন—এটি আর নিছক স্বেচ্ছা অনুদান থাকে না।
খাবারের বিষয়টিও এখানে ভাবার মতো। কোনো ধর্মীয় আয়োজনের তবারুক বা আপ্যায়ন যদি ভালোবাসার অংশ হয়, তাহলে সেটি মানুষের মধ্যে আনন্দ ও সম্প্রীতি তৈরি করার কথা। কিন্তু যদি এমন ধারণা তৈরি হয় যে ‘চাঁদা দিলে বিরানি বাসায় যাবে, না দিলে যাবে না’, তাহলে সেই আপ্যায়নের অর্থই বদলে যায়। তখন প্রশ্ন উঠতে পারে—এটি কি ভালোবাসার তবারুক, নাকি চাঁদার সঙ্গে যুক্ত একটি সামাজিক সুবিধা?
অবশ্যই সব আয়োজনকে একই চোখে দেখা ঠিক হবে না। অনেক আয়োজক নিজের সামর্থ্য ও মানুষের সহযোগিতায় অনুষ্ঠান করেন এবং কাউকে অর্থ দেওয়ার জন্য চাপ দেন না। অনেক জায়গায় চাঁদা দেওয়া-না দেওয়ার সঙ্গে খাবার পাওয়ারও কোনো সম্পর্ক থাকে না। তাই কোনো বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা দিয়ে সব আয়োজনকে বিচার করার সুযোগ নেই।
তবু যে জায়গায় এমন অভিজ্ঞতা তৈরি হচ্ছে, সেখানে আয়োজকদের নিজেদেরও একটু ভাবা দরকার।
কারণ ধর্মীয় আয়োজনের সবচেয়ে বড় শক্তি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা। সেই ভালোবাসাকে যদি চাঁদার অঙ্ক দিয়ে মাপা শুরু হয়, তাহলে আয়োজনের মূল সৌন্দর্যটাই হারিয়ে যেতে পারে।
চাঁদা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তা হতে হবে স্বেচ্ছায়। কেউ দেবেন, কেউ দেবেন না—দুটোকেই সমানভাবে সম্মান করতে হবে। কেউ অল্প দেবেন, কেউ বেশি দেবেন—অঙ্কের পার্থক্য দিয়ে কারও ধর্মীয় অনুভূতি বা অংশগ্রহণের মূল্য নির্ধারণ করা উচিত নয়।
রসিদও হওয়া উচিত একটি বিনীত অনুরোধ, কোনো সামাজিক দায়বদ্ধতার দলিল নয়।
আমাদের আরও মনে রাখা দরকার, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শের আলোচনায় মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা, সৌজন্য ও মর্যাদার বিষয়গুলোই সামনে আসার কথা। তাঁর নামে আয়োজিত কোনো অনুষ্ঠান যদি কারও মনে অস্বস্তি, চাপ বা বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি করে, তাহলে আয়োজনের পদ্ধতি নিয়ে ভাবার যথেষ্ট কারণ আছে।
রবিউল আউয়াল একদিন শেষ হবেই। মাইকের শব্দ থামবে, ব্যানার নামবে, কমিটির ব্যস্ততাও কমে যাবে। কিন্তু মানুষের মনে কী থেকে যাবে—সেটিই আসল কথা। থাকবে কি নবীপ্রেম, মানবিকতা ও ভালোবাসার স্মৃতি? নাকি থেকে যাবে একটি রসিদ, একটি চাঁদার অঙ্ক, কিংবা সেই আক্ষেপ—‘টাকা না দিলে বিরানিটাও পাওয়া গেল না!’
ধর্মীয় আয়োজন মানুষের হৃদয়ের দরজা খোলার কথা, পকেটের দরজা জোর করে খোলার নয়। নবীপ্রেমের সৌন্দর্য মানুষের হৃদয় জয় করার মধ্যে; মানুষের ওপর আর্থিক বা সামাজিক চাপ সৃষ্টি করার মধ্যে নয়।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু গভীর—মিলাদের নামে আমরা মানুষের কাছ থেকে কী চাইছি—চাঁদা, নাকি ভালোবাসা? আর আমাদের আয়োজন শেষে মানুষের হাতে কী পৌঁছাচ্ছে—ভালোবাসার তবারুক, নাকি সামাজিক চাপের রসিদ?
লেখক: প্রেসিডিয়াম সদস্য, লাভ বাংলাদেশ পার্টি।
স্টাফ রিপোর্টার : : এস.এফ.এম. মোস্তাঈন বিল্লাহ: বান্দরবানের আলীকদম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়, বন ও বৈচিত্র্যময় কৃষিজ à¦...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : উত্তরের পঞ্চগড় থেকে দক্ষিণ-পূর্বের সীমান্ত শহর কক্সবাজার— দেশের দুই প্রান্তকে সরাসরি এক সুতোয়...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : দীর্ঘদিন ধরে ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যানà§...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, একই সময়ে গ্যাস সংকটে কমছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। রান্নার গ্যাস না থাকà...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : অন্ধকারেরও একটা সীমা আছে। রাতের অন্ধকার স্বাভাবিক; কিন্তু মানুষের ঘরে যে অন্ধকার নেমে আসে, তার কার...বিস্তারিত
মুহাম্মদ আমির হোছা্ইন :: : বিগত শতাব্দীতে ইউরোপ জুড়ে তথা পাশ্চাত্যের সমাজে যখন শিল্পবিপ্লব খুব এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন শ্রমিকের à¦...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited