শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৮:১৩ পিএম, ২০২৬-১১-০৬
রাষ্ট্রের হাতে আইন আছে, ক্ষমতা আছে, অপরাধ দমনে প্রশিক্ষিত বাহিনীও আছে। কিন্তু রাষ্ট্রের শক্তির প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায় তখনই, যখন তার হেফাজতে থাকা একজন অসহায় নাগরিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়। কারণ, ক্ষমতার প্রয়োগ যত সহজ, সেই ক্ষমতাকে আইনের সীমার মধ্যে রাখা ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিয়ো সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনেছে। সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী আলী আসগর ইমন তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে ভিডিয়োটি সামনে এনে যে অভিযোগ তুলেছেন, তা উপেক্ষা করার মতো নয়। অভিযোগ, আটক এক তরুণের শরীরে চিমটি কেটে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে পুলিশের ওপর হামলার কথা স্বীকার করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অভিযোগটির সত্যতা অবশ্যই স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হবে। কিন্তু এ অভিযোগের মধ্য দিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠেছে—যাঁদের হাতে আইন রক্ষার দায়িত্ব, তাঁদের বিরুদ্ধেই আইনবহির্ভূত আচরণের অভিযোগ উঠলে নাগরিকের আস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
আলী আসগর ইমনের উত্থাপিত বিষয়টি কেবল একটি ফেসবুক পোস্ট কিংবা ভাইরাল ভিডিয়ো নিয়ে বিতর্ক নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হেফাজতে থাকা ব্যক্তির নিরাপত্তা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহারের প্রশ্ন। কোনো সাংবাদিক বা মানবাধিকারকর্মী যখন এমন গুরুতর অভিযোগ জনসমক্ষে আনেন, তখন সেটিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাময়িক আলোচনার বিষয় ভেবে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগ সত্য কি না, তা নির্ধারণ করবে নিরপেক্ষ তদন্ত। তবে তদন্তের আগেই অভিযোগকে অস্বীকার করা কিংবা দায়সারা বক্তব্য দিয়ে এড়িয়ে যাওয়াও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।
গাজীপুরের শ্রমিক আন্দোলনের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহও এ আলোচনার বাইরে নয়। পোশাকশ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দাবিকে কেন্দ্র করে অক্টোবরের শেষ দিকে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, মৌচাক, সফিপুর, চন্দ্রা ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ৩১ অক্টোবরের সংঘর্ষে শ্রমিক ও পুলিশ সদস্যসহ অনেকে আহত হন। বিভিন্ন স্থানে যানবাহন ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও স্থাপনায় হামলার ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় পরবর্তী সময়ে একাধিক মামলা দায়ের করে পুলিশ। ২ নভেম্বর তিনটি মামলায় প্রায় চার হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা এবং অন্তত ৩০ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। আন্দোলনের মধ্যে ভাঙচুরের দৃশ্য ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার পোশাকশ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও বেদনাবিধুর করে তোলে।
এই ঘটনাপ্রবাহে শ্রমিকদের ক্ষোভ, সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই; আবার আন্দোলনের নামে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা মানুষের জানমালের ক্ষতিসাধনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কিন্তু এসবের কোনোটিই কাউকে আইনবহির্ভূত আচরণের ছাড়পত্র দেয় না। কোনো ব্যক্তি আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন কিংবা কোনো ঘটনায় সন্দেহভাজন হয়েছেন বলেই তিনি অপরাধী হয়ে যান না। অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে আটক করা যেতে পারে, তদন্ত হতে পারে, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা যেতে পারে। অপরাধ প্রমাণিত হলে বিচারিক প্রক্রিয়ায় শাস্তিও হতে পারে। আইনের পথ এটাই।
সেই পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও। পুলিশের দায়িত্ব অপরাধী শনাক্ত করা, প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কাউকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে অপরাধ স্বীকার করানো পুলিশের দায়িত্বের অংশ হতে পারে না। পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ থাকলে তার যথাযথ তদন্ত হবে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হবে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু জোর করে আদায় করা বক্তব্য কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না। বরং এমন অভিযোগ তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের ৫ দফায় নির্যাতন এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক ও লাঞ্ছনাকর আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-তেও এ ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ, অপরাধের অভিযোগে আটক হলেও একজন নাগরিক তাঁর মানবিক মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার হারান না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদেরও সংবিধান ও আইনের সীমার মধ্যেই দায়িত্ব পালন করতে হয়। ইউনিফর্ম কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দেয় না; বরং সেই পোশাকের মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
হেফাজতে থাকা একজন মানুষের অসহায়ত্বের দিকটিও এখানে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। বাইরে থেকে তাঁর পক্ষে নিজের বক্তব্য তুলে ধরা কিংবা নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি তখন সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও তত্ত্বাবধানে থাকেন। তাই হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে তদন্তে গড়িমসি করার সুযোগ নেই। অভিযোগকারীর বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা, ভিডিয়োর মূল সংস্করণ এবং প্রয়োজনীয় আলামত পরীক্ষা করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করতে হবে। তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য।
আলী আসগর ইমনের উত্থাপিত অভিযোগের ক্ষেত্রেও কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। ভিডিয়োতে থাকা তরুণের পরিচয় কী? তাঁকে কোথা থেকে এবং কোন অভিযোগে আটক করা হয়েছিল? পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে কি না? ভিডিয়োতে দৃশ্যমান পুলিশ সদস্যদের পরিচয় কী? সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কী বলছে? এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব। তদন্তের আগে কাউকে অপরাধী কিংবা নির্যাতনকারী আখ্যা দেওয়া যেমন অনুচিত, তেমনি অভিযোগের গুরুত্ব অস্বীকার করে নীরব থাকাও দায়িত্বশীল আচরণ নয়। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে; আর সত্যতা না মিললে তদন্তের ফলও জনসমক্ষে স্পষ্ট করতে হবে।
এ ঘটনার সঙ্গে শ্রমিকের অধিকার ও জীবনের বাস্তবতাও গভীরভাবে জড়িত। যে শ্রমিকের শ্রমে শিল্পকারখানা সচল থাকে, দেশের রপ্তানি আয় বাড়ে এবং অর্থনীতির চাকা ঘোরে, তাঁর জীবন ও মর্যাদা রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্ব পাওয়ারই কথা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বেতন-ভাতার অসংগতি শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করলে তার সমাধান হতে হবে আলোচনার মাধ্যমে। মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রের মধ্যে কার্যকর সংলাপের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। শ্রমিকের ন্যায্য দাবি সময়মতো বিবেচনায় না নিলে অসন্তোষ বাড়বে, সংঘাতের আশঙ্কাও তৈরি হবে। একই সঙ্গে আন্দোলনের নামে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি করার প্রবণতার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অধিকার আদায়ের আন্দোলন যেমন ন্যায্য, তেমনি সেই আন্দোলনে অন্যের অধিকার ও নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করার অধিকার কারও নেই।
পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা একটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এই আস্থা গড়ে ওঠে পেশাদারত্ব, ন্যায়সংগত আচরণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মধ্য দিয়ে। কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তার নিষ্পত্তি করাই বাহিনীর মর্যাদা রক্ষার পথ। অভিযোগ আড়াল করা কিংবা দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে সন্দেহ আরও বাড়বে। একজন সদস্যের অনিয়মের দায় যেন পুরো বাহিনীর ওপর না পড়ে, তা নিশ্চিত করারও উপায় একটাই—অনিয়মের বিরুদ্ধে বাহিনীর নিজস্ব কঠোর অবস্থান এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি।
রাষ্ট্রের শক্তি কেবল গ্রেপ্তারের সংখ্যা কিংবা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং কতটা ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলো, ক্ষমতাহীন মানুষের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভুলের দায় কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে নির্ধারিত হলো—সেখানেই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায়। পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ যেমন গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে, তেমনি পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগও সমান গুরুত্বে দেখতে হবে। একটি অপরাধের বিচার করতে গিয়ে আরেকটি অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই।
আলী আসগর ইমন যে অভিযোগটি সামনে এনেছেন, তার নিরপেক্ষ তদন্ত এখন জরুরি। বিষয়টি শুধু একজন তরুণের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; হেফাজতে থাকা প্রতিটি নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের প্রশ্নও। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, ক্ষমতার অপব্যবহারের দায় ইউনিফর্মের আড়ালে আড়াল করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে তদন্তের ফল জনসমক্ষে প্রকাশ করে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
একজন শ্রমিকের শরীরে চিমটি কেটে হয়তো তাঁর মুখ থেকে কথা বের করার চেষ্টা করা যায়, ভয় দেখিয়ে হয়তো কিছু সময়ের জন্য তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করা যায়; কিন্তু তাতে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় না। সত্যের ভিত্তি নির্যাতন নয়, প্রমাণ; ভয়ভীতি নয়, ন্যায়বিচার। যে শ্রমিকের ঘামে দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, তাঁর মর্যাদা রক্ষাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পুলিশের হাতে ক্ষমতা থাকবে, অপরাধের বিচারও হবে; কিন্তু সেই ক্ষমতার প্রয়োগ হতে হবে আইনের সীমার মধ্যে। কোনো অপরাধী যেন বিচারের বাইরে না থাকে, আবার কোনো নিরপরাধ মানুষও যেন নির্যাতনের শিকার না হন। আইনের শাসনের দাবি এটুকুই—আইন সবার জন্য সমান, আর আইনরক্ষকও আইনের ঊর্ধ্বে নন।
লেখক: সাহিত্য ও মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।
আমাদের ডেস্ক : : নতুন এক দেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্ত...বিস্তারিত
খবর বিজ্ঞপ্তি : ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বলেছেন, সাংবà...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিচতলায় ন্যায্যমূল্যের নামে পরিচালিত ওষুধের দোকানে অতিà...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সিঙ্গাপুরà§...বিস্তারিত
ঢাকা অফিস : : রাজধানীর মিরপুরে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভে ‘বিশেষ উদ্দেশ্য’ রয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। আন্দো...বিস্তারিত
ঢাকা অফিস : : দীর্ঘদিন ধরে জমির সীমানা নির্ধারণ না করা এবং পরে জমির সীমানা নির্ধারণ ও নামজারি সম্পন্ন করে দেওয়à...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited