শিরোনাম
খবর বিজ্ঞপ্তি | ০৫:৩১ পিএম, ২০২৬-০৯-৩০
একসময় যেসব রেলপথে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেনের ছুটে চলা ছিল নিয়মিত দৃশ্য, এখন সেসব পথেই দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। কোনো ট্রেন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ, কোনোটি আবার ইঞ্জিন মিললে চলছে, না মিললে বন্ধ থাকছে।
কোথাও কমেছে ট্রেনের সংখ্যা, কোথাও শিডিউলে থাকলেও বাস্তবে চলছে না। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে সামনে আসছে লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন এবং ট্রেন পরিচালনার প্রয়োজনীয় জনবল সংকট।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর। লোকাল ও মেইল ট্রেনের কম ভাড়ায় যাতায়াতের সুযোগ হারিয়ে তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে বাস, সিএনজি অটোরিকশা কিংবা তুলনামূলক বেশি ভাড়ার আন্তঃনগর ট্রেনের ওপর।
এতে বাড়ছে যাতায়াত ব্যয়, সময় ও ভোগান্তি। একই সঙ্গে ছোট স্টেশনকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কৃষিপণ্য পরিবহনেও তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ।
একে একে হারিয়ে যাচ্ছে ‘গরিবের ট্রেন’
ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথই এর বড় উদাহরণ। একসময় এ পথে ছয়টি লোকাল ও মেইল ট্রেন চলাচল করত। ২০২০ সালের মার্চে করোনাকালে চারটি লোকাল ট্রেন ও ঈশা খাঁ মেইল বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হলেও এসব ট্রেন আর ফিরেনি।
ময়মনসিংহ-ভৈরব রুটের ঈশা খাঁ মেইল দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ। এ রুটের আরও দুই জোড়া লোকাল ট্রেনও প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলাচল করছে না। ময়মনসিংহ-ঝারিয়া রুটের কয়েকটি লোকাল ট্রেনও অনিয়মিতভাবে চলছে বলে স্থানীয় যাত্রীদের অভিযোগ।
সর্বশেষ ২৪ আগস্ট ইঞ্জিন সংকটে বন্ধ হয়ে যায় টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের ইব্রাহিমাবাদ থেকে ময়মনসিংহ হয়ে চট্টগ্রামগামী ময়মনসিংহ মেইল, স্থানীয়ভাবে পরিচিত নাসিরাবাদ মেইল। তবে ছয়দিন পর মেরামত করা একটি ইঞ্জিন দিয়ে ৩১ আগস্ট ট্রেনটি পুনরায় চালু করা হয়। ফলে এ ট্রেনের ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছে নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন-ইঞ্জিনের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করছে সেবা সচল থাকা।
৪০ টাকার যাত্রায় এখন ১২৭ টাকা
ভৈরব থেকে ময়মনসিংহের দূরত্ব ১১৬ কিলোমিটার। এ পথে লোকাল ট্রেনের ভাড়া ছিল ৪০ টাকা, মেইল ট্রেনে ৫৫ টাকা। বিপরীতে আন্তঃনগর ট্রেনে একই পথের ভাড়া ১২৭ টাকা। আবার আন্তঃনগর ট্রেন সব স্টেশনে থামে না। অর্থাৎ লোকাল ট্রেনে ৪০ টাকায় যে যাত্রা করা যেত, একই পথে আন্তঃনগর ট্রেনে যেতে লাগছে তিন গুণেরও বেশি টাকা। আর ছোট স্টেশনের যাত্রীদের ক্ষেত্রে আন্তঃনগর ট্রেনের বিকল্পও সবসময় নেই। ফলে তাদের স্টেশন থেকে গন্তব্যে যেতে বাড়তি যানবাহন ধরতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন শ্রমজীবী, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়ের মানুষ। বৃহত্তর ময়মনসিংহের অনেক মানুষ ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে কাজ করেন। কম ভাড়ার ট্রেনগুলো ছিল তাঁদের নিয়মিত যাতায়াতের অন্যতম ভরসা। ট্রেন বন্ধ বা অনিয়মিত হওয়ায় এখন অনেককে একাধিক যানবাহন ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে সময় ও খরচ।
৫০ স্টেশন পেরিয়ে চলত নাসিরাবাদ
ময়মনসিংহ মেইল শুধু যাত্রীবাহী একটি ট্রেন নয়, এটি ছিল বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের একটি সাশ্রয়ী মাধ্যম। ইব্রাহিমাবাদ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রায় ৬৩১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া ট্রেনটির ৫০টি স্টেশনে যাত্রাবিরতি ছিল। ইব্রাহিমাবাদ থেকে ভৈরব অংশেই ২৭টি স্টেশনে থামত ট্রেনটি। ফলে ছোট ছোট স্টেশন ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও আন্তঃনগর ট্রেনের তুলনায় সহজে এ সেবা ব্যবহার করতে পারতেন।
এসব স্টেশন ঘিরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় বাজার ও ছোট ব্যবসা। কৃষকরা ধান, দুধ, ডিম, কলা, মুরগি, ফলমূল ও শাকসবজি নিয়ে বাজারে যেতেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করতেন। ট্রেন বন্ধ হলে শুধু যাত্রীর নয়, এসব পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যায়।
চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও দীর্ঘদিন ধরে ময়মনসিংহগামী ৩৭ ও ৩৮ নম্বর ট্রেন ব্যবহার করে পণ্য আনা-নেওয়া করতেন বলে ব্যবসায়ীরা রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপককে দেওয়া চিঠিতে জানিয়েছেন।
পূর্বাঞ্চলজুড়ে একই সংকট
সমস্যাটি শুধু ভৈরব-ময়মনসিংহ রুটে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে প্রতিদিন দেড় শতাধিক ট্রেন চলাচলের সূচি রয়েছে। এর মধ্যে আন্তঃনগর, কমিউটার, মেইল ও লোকাল ট্রেন রয়েছে। কিন্তু লোকোমোটিভ ও ট্রেন পরিচালনার প্রয়োজনীয় ক্রু সংকটের কারণে সূচিতে থাকা অনেক ট্রেন নিয়মিত চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
জানা গেছে, প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ ও ট্রেন ক্রু-চালক, সহকারী চালক ও গার্ড-সংকটের কারণে মাসে গড়ে প্রায় ৬০০টি ট্রেন বাতিল বা আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
রেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বরে যথাক্রমে ৫৪৬, ৫৮৯ ও ৫৭৪টি ট্রেন বাতিল করা হয়। অর্থাৎ শিডিউলে ট্রেন থাকলেও বাস্তবে সেটি চালানোর সক্ষমতা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি।
পুরোনো ইঞ্জিনেও বাড়ছে নির্ভরতা
পূর্বাঞ্চলের সংকটের আরেকটি বড় কারণ লোকোমোটিভের বয়স। এ অঞ্চলের রেলপথের বড় অংশ মিটার গেজ হওয়ায় মিটার গেজ লোকোমোটিভের ওপর নির্ভরতা বেশি। রেলওয়ের ১৬২টি মিটার গেজ লোকোমোটিভের প্রায় ৬৯ শতাংশ অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে।
ফলে একটি ইঞ্জিন বিকল হলে শুধু একটি ট্রেন নয়, একই ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরশীল একাধিক ট্রেনের শিডিউলেও প্রভাব পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেরামত করা পুরোনো ইঞ্জিন দিয়েই গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন চালু রাখতে হচ্ছে।
বন্ধ ট্রেনের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে
২০২০ সালের পর পূর্বাঞ্চলে একাধিক মেইল ও কমিউটার ট্রেন স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের ঈশা খাঁ মেইল, ময়মনসিংহ-ইব্রাহিমাবাদ রুটের ধলেশ্বরী মেইল, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ রুটের ভাওয়াল মেইল এবং ইব্রাহিমাবাদ-ঢাকা রুটের টাঙ্গাইল কমিউটারসহ কয়েকটি ট্রেনের সেবা বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে রেলসেবা সংকুচিত হচ্ছে দিনদিন। ময়মনসিংহ অঞ্চলের বেশিরভাগ লোকাল ট্রেন বন্ধ রয়েছে। সেখানে রেলওয়ের স্থানীয় কর্মকর্তারাও ইঞ্জিন সংকটকে ট্রেন বন্ধ থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে জানিয়েছেন।
সিলেট-চট্টগ্রাম রুটের জালালাবাদ এক্সপ্রেস এবং চট্টগ্রাম থেকে ভৈরব-ময়মনসিংহ হয়ে ইব্রাহিমাবাদ পর্যন্ত চলাচলকারী নাসিরাবাদ মেইল নিয়েও অনিয়মিততার অভিযোগ রয়েছে। ফলে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে কম ভাড়ার ট্রেনসেবার ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
রেলসেবার সংকটে বাড়ছে সড়কে চাপ
লোকাল ও মেইল ট্রেন বন্ধ হলে যাত্রীরা যে শুধু বেশি ভাড়া দেন তা নয়, তাদের বড় অংশকে সড়কপথে যেতে হয়। এতে বাস, সিএনজি অটোরিকশা ও অন্যান্য পরিবহনের ওপর চাপ বাড়ে। প্রত্যন্ত এলাকার যাত্রীদের ক্ষেত্রে একাধিক যানবাহন পরিবর্তন করতে হয়।
ফলে রেলপথে একটি ট্রেন বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু রেলযাত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে সড়ক পরিবহন, স্থানীয় বাজার, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং স্টেশনকেন্দ্রিক ছোট ব্যবসায়ও।
রেলওয়ের পরিবহন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দ্বিতীয় শ্রেণির লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেন গ্রামীণ ও উপশহরের মানুষের দৈনন্দিন জীবন এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এসব ট্রেন বন্ধ থাকলে রেলের রাজস্ব কমার পাশাপাশি আন্তঃনগর ট্রেনেও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মামুনুল ইসলাম বলেন, রেলওয়ে শুধু লাভের জন্য ট্রেন পরিচালনা করে না; রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি সব শ্রেণির মানুষকে সেবা দেওয়াও এর দায়িত্ব। তবে বর্তমানে রেলওয়ে তীব্র লোকোমোটিভ সংকটে রয়েছে। এ কারণে কিছু ট্রেন নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, শিডিউলে থাকা এসব ট্রেন সুযোগ পেলেই চালুর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে যোগাযোগসেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
সিলেট রুটে চলাচলকারী জালালাবাদ এক্সপ্রেসের নিয়মিত যাত্রী বেলাল উদ্দিন বলেন, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য লোকাল ও মেইল ট্রেনের বিকল্প নেই। এসব ট্রেন কখনো বন্ধ, কখনো অনিয়মিত হওয়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
তিনি বলেন, বন্ধ বা অনিয়মিত হয়ে পড়া ট্রেনগুলো কবে পুরোপুরি নিয়মিত হবে, তার সুনির্দিষ্ট উত্তর যাত্রীদের কাছে নেই। কম ভাড়ার ট্রেনগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন আয়ের মানুষ।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে ইঞ্জিন ও জনবল সংকটের কারণে একদিকে যেমন শিডিউল অনুযায়ী ট্রেন চালানো যাচ্ছে না, অন্যদিকে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা লোকাল-মেইল ট্রেনও ফিরছে না।
নিজস্ব প্রতিবেদক : সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে এবার চোখে কালো কাপড় বে...বিস্তারিত
স্টাফ রিপোর্টার : : জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দ্রুত বদলে যাচ্ছে পৃথিবীর পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রা। বাড়ছে তাপমাত্à¦...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রামে পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে বাসায় ফেরার পথে ‘দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম’-এর সহ-সম্পাদক ও স...বিস্তারিত
স্টাফ রিপোর্টার : : আহমদ উল্লাহ শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সেইফ ডায়াবেটিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের উদ্য...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : ‘গত আড়াই বছরে ৫০ বারের মতো সাক্ষাৎকার দিয়েছি বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে। কিছুতেই তো কিছু হলো না। এখন à¦...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় প্রতিদিনই উদ্ধার হচ্ছে মরদেহ। প্রথমে অজ্ঞাত হিসেবে উদ্à...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited