শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০১:৩৬ পিএম, ২০২৬-০৮-০৬
হাসপাতালের করিডোরে অপেক্ষমাণ স্বজনদের একটাই প্রার্থনা—প্রিয় মানুষটি যেন সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন। অস্ত্রোপচার কক্ষের লাল বাতি নিভে যাওয়ার পর চিকিৎসকের একটি আশ্বাসই অনেক পরিবারের কাছে নতুন জীবনের বার্তা। কিন্তু সেই হাসপাতালকে ঘিরেই যখন একের পর এক চিকিৎসাগত অবহেলার অভিযোগ, প্রসূতি সেবা নিয়ে প্রশ্ন, নবজাতকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং জবাবদিহির সংকট দেখা দেয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারের নয়; পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকেই নড়িয়ে দেয়। আস্থা গড়ে তুলতে সময় লাগে, কিন্তু ভেঙে যেতে লাগে খুব অল্প সময়।
চট্টগ্রামের পার্কভিউ হাসপাতালকে ঘিরে সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো আবারও সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৪ আগস্ট চান্দগাঁওয়ের সাজু আক্তারের সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে একই দিন রাতে তাঁকে পুনরায় অস্ত্রোপচার করতে হয়। একই দিনে আগ্রাবাদের মারিয়ার ক্ষেত্রেও অনুরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে তাঁর স্বজনদের অভিযোগ। তাঁদের দাবি, ডা. ফারজানা শিখার চিকিৎসাগত অবহেলার কারণেই দ্বিতীয় দফা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়। আরও অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসাসংক্রান্ত কিছু কাজ অনভিজ্ঞ ওয়ার্ড বয় দিয়ে করানো হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।
এ ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ আছে কি না, সেটিই এখন প্রশ্ন। কয়েক মাস আগেও একই হাসপাতালের গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. তৌফিকুন্নাহার মোনার বিরুদ্ধে প্রসবকালীন দুই নবজাতক গুরুতরভাবে আহত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অভিযোগকারীদের দাবি, দায় নির্ধারণের পরিবর্তে ঘটনাটি দ্রুত ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে ওই অভিযোগের তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়। ফলে নতুন অভিযোগ উঠলেই পুরোনো প্রশ্নগুলো ফিরে আসে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে জটিলতা থাকবেই। প্রতিটি জটিলতার জন্য চিকিৎসক দায়ী—এমনটি বলা যায় না। কিন্তু গুরুতর অভিযোগের পর দ্রুত, স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত না হলে জনমনে অবিশ্বাস বাড়ে। অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, তা নির্ধারণের একমাত্র পথ হলো তথ্যভিত্তিক তদন্ত।
আরও উদ্বেগের বিষয়, অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে সাংবাদিকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যদি তা সত্য হয়, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাব তথ্য দিয়ে দিতে হয়; নীরবতা বা বিরূপ আচরণ দিয়ে নয়।
এখানে আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ—চিকিৎসাগত ভুলের দায় কি শুধু একজন চিকিৎসকের, নাকি পুরো প্রতিষ্ঠানের? অস্ত্রোপচার কক্ষ, নার্সিং তদারকি, জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং রোগীর নিরাপত্তা—সবই হাসপাতালের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। তাই গুরুতর অভিযোগ উঠলে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাও জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না।
রোগীর অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ চিকিৎসা, চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য ও নথি পাওয়ার অধিকার এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত—এসব নিশ্চিত না হলে স্বাস্থ্যসেবার প্রতি মানুষের আস্থা টিকে না।
বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। মানুষ বিপুল অর্থ ব্যয় করে উন্নত চিকিৎসার আশায় এসব হাসপাতালে যান। কিন্তু একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বারবার একই ধরনের অভিযোগ উঠলে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরই আস্থার সংকট তৈরি হয়।
এখন প্রয়োজন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জন কার্যালয়, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে মেডিকেল অডিট, স্বাধীন তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং ফলাফল প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ সত্য হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও সমান স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকাশ করতে হবে।
একটি হাসপাতালের পরিচয় শুধু ভবন বা আধুনিক যন্ত্রপাতিতে নয়; রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসার মান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতেই। যে অপারেশন থিয়েটারে নতুন জীবনের সূচনা হওয়ার কথা, সেটি যদি মানুষের মনে ভয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি হাসপাতাল নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাস। তাই পার্কভিউ হাসপাতালকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর দ্রুত, স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
লেখক : রাজনীতিক, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী।
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ফল প্রকাশের পর মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠে কয়েকটি সংখ্যা। কারও জন্য সেই সংখ্যা আনন্দের, কারও জন্য হতা...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গণমাধ্যমকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বৈষম...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে যেমন প্রকাশ করে, তেমনি মানুষের মানবিকতা, রাষ্ট্...বিস্তারিত
আ.ন.ম. তাজওয়ার আলম : বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ইতিহাসে তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প একট...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : বিধির পোশাকে তিনি শৃঙ্খলার প্রহরী এক দীপ্তিমান নাম, কাব্যের অলিন্দে জ্বালান তিনি মননের অনির্বাণ ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ধোঁয়ার কুণ্ডলীর ভেতরে মানুষ খুঁজে পায় সাময়িক প্রশান্তি, কেউ খুঁজে পায় অভ্যাস, আর কেউ ক্লান্ত জীবনে...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited