চট্টগ্রাম   মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬  

শিরোনাম

সবাই সরকারপন্থী জাতীয়তাবাদী হলো কেমন করে?

বিপ্লব-পরবর্তী রাজনীতির আড়ালে সুবিধাভোগী চক্র, প্রশাসনে প্রভাব ও চট্টগ্রামের অদৃশ্য ক্ষমতার বলয়

আ.ন.ম. তাজওয়ার আলম    |    ০৮:০৬ পিএম, ২০২৬-১০-০৫

সবাই সরকারপন্থী জাতীয়তাবাদী হলো কেমন করে?

দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি - সবাই হঠাৎ সরকারপন্থী জাতীয়তাবাদী হলো কেমন করে? আগে যারা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দল বলে দাপট দেখাতো, আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি জাহির করতো, আজ তারাই বিপ্লবের পর নিজেদের বিপ্লবী দাবি করছে। আওয়ামী লীগকে গালমন্দ করছে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানা সমালোচনা করে নিজেদের নতুন করে পরিচিত করার চেষ্টা করছে। প্রশ্ন হলো-এরা এত দ্রুত বদলে গেল কীভাবে? গতকাল যারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিল, আজ তারা কীভাবে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থী হয়ে গেল? নাকি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে শুধু মুখোশটাই পরিবর্তন হয়েছে?

বাস্তবতা হলো, দেশের রাজনীতিতে একটি সুবিধাভোগী চক্র দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের অবস্থান তৈরি করে রেখেছে। ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, তারা কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করে। সরকারের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করে, ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধা নেয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ও বদলে ফেলে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো- ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা এই চক্রটিকে চেনার চেষ্টা করছেন না। অথবা চিনলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। যাদের একসময় আওয়ামী লীগের জন্য জান-মাল কোরবান করতে সর্বদা প্রস্তুত দেখা যেত, তাদের অনেককেই এখন জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থী পরিচয়ে দারুণ নিরাপত্তায় জীবনযাপন করতে দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে, কিন্তু তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি কেন কমেনি - এটাই এখন বড় প্রশ্ন।

চিহ্নিত আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী এমপির দাপট এখনো চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ- সিএমপি প্রশাসনে রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার তদবিরে থানায় মামলা গ্রহণ, ধরপাকড় এবং নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে- এমন অভিযোগও একাধিক মহলে রয়েছে।

যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই- আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পরও তাদের প্রভাবশালী নেতাদের প্রভাব প্রশাসনে কীভাবে টিকে আছে? পালাতক সরকারের বিলুপ্ত সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হিসেবে পরিচিত ব্যক্তির দাপট কেন কমেনি?

বরং অভিযোগ রয়েছে, অর্থবিত্ত ও পুরোনো যোগাযোগের মাধ্যমে বর্তমান সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন মহলকে তারা কাবু করে রেখেছে। তাদের কার্যক্রম থেমে নেই; বরং আগের মতোই চলছে, শুধু পরিচয় ও কৌশল বদলেছে।

আরও গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে- দেশকে অস্থিতিশীল করতে তারা কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অর্থ ও বিভিন্নভাবে শেল্টার দিয়ে আসছে। দেশপ্রেমিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এসব বিষয়ে একাধিকবার সরকারকে রিপোর্ট দিয়েছে বলেও বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, সেই রিপোর্টের পর ব্যবস্থা কোথায়?

কেন এখনো তাদের দাপটের সিংহাসন এক চুলও নড়েনি?:
বরং অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ প্রশাসনের মাধ্যমে তারা ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা নিয়ে নিজেদের এক ধরনের মাফিয়া আস্তানা গড়ে তুলেছে। সাধারণ মানুষ যেখানে নিরাপত্তার জন্য থানায় গিয়ে হয়রানির শিকার হয়, সেখানে প্রভাবশালী ব্যক্তির নিরাপত্তায় রাষ্ট্রের এত আয়োজন কেন- এ প্রশ্নের উত্তরও জনগণ জানতে চায়।

একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে একটি বিশেষ চক্র তাদের আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। সেই অর্থ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের সর্বদলীয় মাফিয়া সিন্ডিকেটের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আর এই চক্রের বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা লিখলেই শুরু হয় অন্য খেলা। সাংবাদিকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা, হুমকি এবং বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীরা প্রশাসনের কাছে বারবার গেলেও অনেক ক্ষেত্রে সিএমপির থানাগুলোতে মামলা নিতে অনীহা দেখা যাচ্ছে।
তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?

প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করলে যদি হামলার ভয় থাকে, মামলা দিয়ে হয়রানির ভয় থাকে এবং থানায় গিয়ে অভিযোগ করলেও মামলা নেওয়া না হয়-  তাহলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোথায়?
এভাবে একটি চক্র শুধু প্রশাসন নয়, গণমাধ্যমকেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য। কারণ গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করা মানে শুধু একজন সাংবাদিককে থামিয়ে দেওয়া নয়; এর অর্থ হলো সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারকে আড়াল করার সুযোগ তৈরি করা।

এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো- এই সুবিধাভোগী চক্রকে চিহ্নিত করা। কে গতকাল কার সঙ্গে ছিল, আজ কার সঙ্গে আছে, কীভাবে সম্পদ করেছে, কার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, কার মাধ্যমে প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করছে এবং কার আশ্রয়ে নিজেদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে- এসব বিষয় খতিয়ে দেখা। রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেই অতীত মুছে যায় না। 

গতকাল যারা আওয়ামী লীগের হয়ে মাঠে ছিল, আজ তারা জাতীয়তাবাদী কিংবা ইসলামপন্থী হলেই তাদের অতীতের ভূমিকা ভুলে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। আবার কারও বিরুদ্ধে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ব্যবস্থা নেওয়াও ঠিক নয়। প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট তদন্ত, তথ্য-প্রমাণ এবং আইনের প্রয়োগ।


সরকারকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে- রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্রের মতো করে কোনো সিন্ডিকেট চলবে কি না। প্রশাসন কারও ব্যক্তিগত তদবিরে চলবে, নাকি আইনের ভিত্তিতে চলবে? থানায় মামলা রাজনৈতিক পরিচয় ও অর্থের প্রভাবে হবে, নাকি ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে হবে? দেশের অস্থিতিশীল পরিবেশ শান্ত করতে হলে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনই দিতে হবে। কারণ ক্ষমতার পরিবর্তনের পর যদি শুধু স্লোগান বদলায়, পরিচয় বদলায়, কিন্তু সুবিধাভোগী মানুষগুলো একই থাকে- তাহলে জনগণের প্রত্যাশিত পরিবর্তন কোথায়?

দেশের স্বার্থে এখনই সময় এই সুবিধাভোগী সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করার। যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রশাসনকে প্রভাবমুক্ত করতে হবে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করতে হবে।

দেশকে অস্থিতিশীল করার এই অপচেষ্টা বন্ধ করতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো রাস্তা নেই।

লেখক: বার্তা সম্পাদক , দৈনকি আমাদের চট্টগ্রাম। 

রিটেলেড নিউজ

চট্টগ্রামে ফাউন্ডার্স গেট টুগেদারে স্পন্সর হিসেবে জৌদ

চট্টগ্রামে ফাউন্ডার্স গেট টুগেদারে স্পন্সর হিসেবে জৌদ

মামুনুর রশিদ সেলিম : চট্টগ্রামে উদ্যোক্তাদের নিয়ে নেক্সট লিডার্সের ‘ফাউন্ডার্স গেট-টুগেদার অ্যান্ড নেটওয়ার্কিং সে...বিস্তারিত


ফটোকার্ডে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’: তকমার আড়ালের সত্য কোথায়?

ফটোকার্ডে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’: তকমার আড়ালের সত্য কোথায়?

আবদুল্লাহ মজুমদার : : ফেসবুকের দেয়ালে হঠাৎ একটি ছবি ভেসে ওঠে। পরিচিত কোনো মুখ—কখনো মঞ্চে, কখনো সভায়, কখনো কোনো অনুষ্ঠাà¦...বিস্তারিত


 ক্ষমতার পালাবদল, শিল্পীর পরিণতি এবং গণতন্ত্রের মানদণ্ড

 ক্ষমতার পালাবদল, শিল্পীর পরিণতি এবং গণতন্ত্রের মানদণ্ড

আবদুল্লাহ মজুমদার : : ক্ষমতার আলো যেমন চিরস্থায়ী নয়, তেমনি তার ছায়াও দীর্ঘস্থায়ী হয়। ইতিহাসের প্রতিটি রাজনৈতিক পা...বিস্তারিত


বাবা : ত্যাগে গড়া এক জীবনের ভিত্তি

বাবা : ত্যাগে গড়া এক জীবনের ভিত্তি

আবদুল্লাহ মজুমদার : : কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবন কোনো শিরোনামে ধরা পড়ে না, কোনো আলোচনায় দীর্ঘ হয় না; তবুও তাঁদের নীরব উপà¦...বিস্তারিত


 ঋণ আদায়ে আইন, আতঙ্ক নয়

ঋণ আদায়ে আইন, আতঙ্ক নয়

আবদুল্লাহ মজুমদার : : বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ এখন আর কেবল একটি আর্থিক সূচক নয়; এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকট। বà§...বিস্তারিত


তামাক: রাজস্বের আড়ালে লুকানো মৃত্যুর বাণিজ্য

তামাক: রাজস্বের আড়ালে লুকানো মৃত্যুর বাণিজ্য

আবদুল্লাহ মজুমদার : : ধোঁয়ার কুণ্ডলীর ভেতরে মানুষ খুঁজে পায় সাময়িক প্রশান্তি, কেউ খুঁজে পায় অভ্যাস, আর কেউ ক্লান্ত জীবনে...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

মন্ত্রণালয়ের আদেশ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিডিএ-তে শিকড় গেঁড়েছেন হারুন!

মন্ত্রণালয়ের আদেশ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিডিএ-তে শিকড় গেঁড়েছেন হারুন!

নিজস্ব প্রতিবেদক : ​সরকারি আদেশ মানেই যেন মগের মুল্লুক! গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট বদলি আদেশকে তোয়াক্কা নà¦...বিস্তারিত


নেশনস কাপের ফাইনালে মুখোমুখি সালাহ-মানে

নেশনস কাপের ফাইনালে মুখোমুখি সালাহ-মানে

স্পোর্টস ডেস্ক : : ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের জায়ান্ট লিভারপুলের জার্সিতে খেলেন দুজনেই। আক্রমণভাগে দুজনের রসায়নে অলরেড...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর