শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৬:২২ পিএম, ২০২৬-০৮-০৬
ক্যালেন্ডারের হিসাবে জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পেরিয়ে গেছে। ২০২৪ সালের জুলাই এখন ইতিহাসের অংশ। রাজপথের উত্তাপ থেমেছে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলেছে, নতুন নতুন ইস্যু এসেছে জনজীবনে। কিন্তু চট্টগ্রামের মুরাদপুর, আন্দরকিল্লা, নিউমার্কেট, ষোলশহর, বহদ্দারহাট কিংবা চমেকের জরুরি বিভাগের করিডোরে গেলে এখনো ফিরে আসে সেই জুলাইয়ের স্মৃতি। আর যেসব পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে, তাদের কাছে সময় যেন আর এগোয়নি।
মুরাদপুরের ব্যস্ত সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো যানবাহন চলাচল করে। মানুষের ভিড়, দোকানপাট, যানজট- সবকিছুই যেন স্বাভাবিক। কিন্তু এই সড়কেই একদিন ঝরে পড়েছিল তরুণ প্রাণ। যে জায়গাগুলোতে রক্ত লেগেছিল, সেগুলো ধুয়ে গেছে অনেক আগেই। কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে সেই রক্তের দাগ এখ স্পষ্ট।
কেউ এখনো মাঝরাতে ঘুম ভেঙে ছেলের নাম ধরে ডাকেন। কেউ প্রতিদিন সন্তানের ছবি দেখে বিচার পাওয়ার প্রার্থনা করেন। আবার কেউ সংসারের সব দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সন্তানদের বড় করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। দুই বছর পরও তাদের জীবনে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই যেন শেষ হয়নি।
যেদিন বদলে গিয়েছিল চট্টগ্রামের রাজপথ
২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরুতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে নগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ষোলশহর রেলস্টেশন হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের অন্যতম সমাবেশস্থল। প্রতিদিন সেখানে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ।
১৫ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরদিন ১৬ জুলাই মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট ও আশপাশের এলাকায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং গুলির ঘটনা ঘটে।
সেদিন নিহত হন চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরাম, ওমরগণি এমইএস কলেজের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ শান্ত এবং ফার্নিচারের দোকানের কর্মচারী মোহাম্মদ ফারুক।
সেই ঘটনার পর আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। পরে তা দেশব্যাপী বৈষম্যবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। জুলাই ও আগস্টজুড়ে চট্টগ্রামে প্রাণ হারান মোট ১৫ জন। এর মধ্যে আটজন নিহত হন মুরাদপুর এলাকায়। আহত হন শতাধিক মানুষ।
‘ছেলের নাম শুনে গর্ব হয়, আবার বুকটা হাহাকার করে ওঠে’
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরাম তখন চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী। ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। চট্টগ্রামে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ হিসেবে তাকে স্মরণ করা হয়।
দুই বছর পরও তার বাবা শফিউল আলমের কণ্ঠে একই সঙ্গে গর্ব আর বেদনার সুর। শফিউল আলম বলেন, ‘কোনো অনুষ্ঠানে গেলে যখন ওয়াসিমের কথা বলা হয়, তখন মনে হয়, আমার ছেলে দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। মানুষ তাকে সম্মান করে, এটাও ভালো লাগে। কিন্তু বাড়িতে ফিরে যখন তার খালি ঘর দেখি, তখন মনে হয় এই সম্মান দিয়ে তো আমার ছেলেকে আর ফিরে পাবো না।’
তিনি জানান, পরিবারের প্রতিটি সদস্য এখনো ওয়াসিমকে মনে করে কাঁদেন। সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছেন মা জ্যোৎস্না বেগম। রাতের ঘুম ভেঙে এখনো তিনি ‘ওয়াসিম’ বলে ডাক দেন। তারপর হঠাৎ থেমে যান। বুঝতে পারেন, যাকে ডাকছেন, সে আর ফিরবে না।
শফিউল আলম বলেন, ‘শুধু যারা গুলি করেছে, তাদের নয়; যারা পরিকল্পনা করেছে, নির্দেশ দিয়েছে, নেতৃত্ব দিয়েছে- সবাইকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। জীবনের শেষ সময়ে অন্তত সেই বিচার দেখে যেতে চাই।’
‘বুঝতেই পারিনি, ছেলেকে শেষবারের মতো দেখতে যাচ্ছি’
১৬ জুলাইয়ের দুপুরটা ফয়সাল আহমেদ শান্তর মা কোহিনুর বেগমের কাছে আজও দুঃস্বপ্ন।
তিনি বলেন, ‘আমি তখন রান্না করছিলাম। হঠাৎ দুইটা ছেলে এসে বললো, আন্টি প্রস্তুত হন, শান্ত গুলি খেয়েছে। আমি তখনো ভাবিনি, ও আর বেঁচে নেই।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে তিনি ছেলেকে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কেউ তাকে শান্তর কাছে নিয়ে যায়নি।
কোহিনুর বেগম বলেন, ‘কিছু কাগজে সই করতে বললো। আমি ভাবলাম চিকিৎসার জন্য লাগবে। পরে বুঝলাম, ওগুলো পোস্টমর্টেমের কাগজ ছিল। তখনই বুঝলাম, আমার শান্তমণি আর নেই।’
এ পর্যন্ত বলেই তিনি থেমে যান। চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ‘মায়ের জীবনে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে?’
শান্তর বাবা মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‘যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা আরও দৃশ্যমান হওয়া উচিত। শুধু স্মরণসভা নয়, বাস্তব সহায়তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।’
সংসারের একমাত্র ভরসা হারিয়ে দিশেহারা সীমা
মোহাম্মদ ফারুকের জীবনে রাজনীতি ছিল না। প্রতিদিনের মতো সেদিনও ফার্নিচারের দোকানে কাজ করতে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু আর ফিরে আসেননি। তাকে হারিয়ে এখন দিশাহারা স্ত্রী সীমা আক্তার।
অসহায় সীমা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘দুপুরে শুনলাম ফারুক গুলি খেয়েছে। হাসপাতালে গিয়ে দেখি সব শেষ। এক মুহূর্তে আমার জীবন বদলে গেছে। সংসারের দায়িত্ব, সন্তানদের ভবিষ্যৎ- সবকিছু একা সামলাতে হচ্ছে।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি চাই না, আর কোনো নারী আমার মতো বিধবা হোক। কোনো সন্তান বাবাকে হারাক, কোনো মা সন্তানের লাশ কাঁধে নিক- এমন দৃশ্য যেন আর কখনো বাংলাদেশে না দেখা যায়।’
বিচারের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, অপেক্ষায় স্বজনরা
শহীদ পরিবারগুলোর অভিযোগ, সময় পেরিয়ে গেলেও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে তাদের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। তাদের মতে, শুধু মামলা দায়ের করাই যথেষ্ট নয়, বিচার শেষ করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারগুলোর দাবি, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার বিষয়গুলোও দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
‘শহীদ পরিবারগুলোর পাশে থাকা রাষ্ট্রের দায়িত্ব’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুদের প্রতি রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায় রয়েছে। তাদের সম্মান, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’
চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে স্বাধীনচেতা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।’
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘স্বজন হারানোর ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে প্রশাসন শহীদ পরিবারগুলোর পাশে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।’
ইতিহাস এগিয়েছে, কিন্তু থেমে আছে কিছু পরিবার
জুলাইয়ের গণআন্দোলন এখন ইতিহাসের অংশ। গবেষণা হবে, বই লেখা হবে, নতুন প্রজন্ম সেই সময়ের কথা জানবে। কিন্তু ওয়াসিম, শান্ত, ফারুক কিংবা অন্যান্য শহীদ পরিবারের কাছে এটি কেবল ইতিহাস নয়, এটি প্রতিদিনের বাস্তবতা।
মুরাদপুরের ব্যস্ত সড়কে দাঁড়িয়ে এখন আর বোঝা যায় না এখানেই একদিন মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েছিল। পাঁচলাইশের হাসপাতালের করিডরে নতুন রোগীর ভিড়। শহর আবার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছে। শুধু ফিরতে পারেনি কয়েকটি পরিবার। তাদের কাছে প্রতিটি জুলাই নতুন করে শোকের মাস। প্রতিটি ১৬ জুলাই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, একদিন একজন ছেলে আর বাড়ি ফেরেনি, একজন স্বামী আর দরজায় কড়া নাড়েননি, একজন সন্তানের অপেক্ষা আর কোনোদিন শেষ হবে না। দুই বছর পরও তাই মুরাদপুরে সময় এগিয়ে গেলেও কিছু মানুষের জীবন থেমে আছে সেই রক্তাক্ত বিকেলেই।
আমাদের ডেস্ক : : নারী ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, সবার জন্য বিনামূলà...বিস্তারিত
খবর বিজ্ঞপ্তি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী হিসেবে সংবিধানে ইসলামী মূ...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : নতুন এক দেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্ত...বিস্তারিত
খবর বিজ্ঞপ্তি : Bangladesh Society for the Enforcement of Human Rights (BSEHR)-এর চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা শাখার দ্বিবার্ষিক নির্বাচন গত ৬ নভেম্বর, শুক্রà¦...বিস্তারিত
বাঁশখালী প্রতিনিধি : : বাঁশখালীতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের ওপর উল্টে গেছে একটি বাস। এ দুর্ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়। এতে আনোয়া...বিস্তারিত
নিজস্ব প্রতিবেদক : নগরের দুটি সরকারি কার্যালয় লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করেছে দুর্বৃত্তরা। তাদের লক্ষ্যবস্তু à¦...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited