শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৪:০৯ পিএম, ২০২৬-০৫-৩১
ধোঁয়ার কুণ্ডলীর ভেতরে মানুষ খুঁজে পায় সাময়িক প্রশান্তি, কেউ খুঁজে পায় অভ্যাস, আর কেউ ক্লান্ত জীবনের ক্ষণিক অবকাশ। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় এই তামাকই আজ রূপ নিয়েছে এক নীরব মৃত্যুর বাণিজ্যে। এটি কেবল একটি পণ্য নয়—এটি এমন এক শিল্প, যা একদিকে রাজস্বের হিসাব বাড়ায়, অন্যদিকে প্রতিদিন অসংখ্য জীবন নিঃশেষ করে দেয়। তাই তামাক প্রশ্নে নীতিনির্ধারণী নীরবতা এখন আর গ্রহণযোগ্য নয়।
তামাকের উৎপত্তি আমেরিকা মহাদেশে। সেখানকার আদিবাসীরা ধর্মীয় আচার ও সীমিত প্রয়োজনে তামাক ব্যবহার করত। ১৫শ শতকে Christopher Columbus আমেরিকায় পৌঁছানোর পর ইউরোপে তামাক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে উপনিবেশবাদী বাণিজ্যের মাধ্যমে এটি এশিয়া ও আফ্রিকায় বিস্তার লাভ করে। উপমহাদেশে মুঘল আমলে প্রবেশ করা এই পণ্য আজ বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক শিল্পে পরিণত হয়েছে—যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়।
বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সত্য হলো—তামাকের কোনো স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নেই। অতীতে এটিকে সাময়িক প্রশান্তি বা সামাজিক অভ্যাস হিসেবে দেখা হলেও তা ছিল ভ্রান্ত ধারণা। এই ভ্রান্তির মূল্য আজ কোটি মানুষের জীবন ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ দিয়ে দিতে হচ্ছে।
তামাকের ক্ষতি বহুমাত্রিক ও ভয়াবহ। এতে থাকা নিকোটিন দ্রুত আসক্তি তৈরি করে, আর টার, কার্বন মনোক্সাইডসহ বিষাক্ত উপাদান শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে ফুসফুস ক্যান্সার, মুখ ও গলার ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ এবং অন্যান্য জটিল রোগ দেখা দেয়। গর্ভবতী নারী ও অনাগত শিশুর জন্যও এটি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। ফলে এটি কেবল ব্যক্তিগত নয়—একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট।
তামাকের সামাজিক প্রভাবও সমানভাবে উদ্বেগজনক। দরিদ্র পরিবারে আয়ের বড় অংশ তামাকে ব্যয় হয়, যা দারিদ্র্যকে আরও গভীর করে। চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পায়, কর্মক্ষমতা কমে যায়, এবং পরোক্ষ ধূমপানের কারণে শিশু ও নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এভাবে তামাক সমাজের ভেতরে এক নীরব ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ তামাকের সঙ্গে যুক্ত। ২০১৭ সালের গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (GATS) অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করতেন। সচেতনতা কিছুটা বাড়লেও পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক।
অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা হলো—তামাক থেকে সরকার বিপুল রাজস্ব আয় করে। সিগারেট, বিড়ি ও জর্দার ওপর আরোপিত কর ও শুল্ক থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)-এ জমা হয়। কিন্তু এই আয়কে কেন্দ্র করে যে নীতিগত স্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়—এই অর্থ কি তামাকজনিত ক্ষতির তুলনায় যথেষ্ট? বাস্তবতা হলো, চিকিৎসা ব্যয়, কর্মঘণ্টা ক্ষতি এবং অকালমৃত্যুর কারণে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তা এই রাজস্ব আয়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি।
এ কারণে তামাককে কেবল “রাজস্ব উৎস” হিসেবে দেখা একটি বিপজ্জনক নীতিগত অবস্থান। রাষ্ট্র যদি সত্যিকারের উন্নয়ন ও জনকল্যাণ চায়, তবে এই দ্বন্দ্ব থেকে বের হয়ে আসা জরুরি।
তামাক নিয়ন্ত্রণে এখন প্রয়োজন কেবল আইন নয়, কঠোর বাস্তবায়ন। পাবলিক প্লেসে ধূমপান সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে, তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা শূন্য সহনশীলতায় আনতে হবে, এবং করনীতি এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে তরুণরা এই নেশার দিকে ঝুঁকতে না পারে। পাশাপাশি তামাকচাষিদের জন্য বিকল্প ফসল ও নিরাপদ জীবিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
জনসচেতনতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে তামাকবিরোধী প্রচারণা জোরদার করতে হবে। যারা তামাক ছাড়তে চান, তাদের জন্য চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং সেবা সহজলভ্য করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তামাক এখন আর সাধারণ অভ্যাস নয়—এটি একটি নীরব অর্থনৈতিক ও সামাজিক যুদ্ধক্ষেত্র। রাষ্ট্র যদি রাজস্বের অঙ্কে আটকে থাকে, তবে প্রতিদিন নতুন মৃত্যুর হিসাব বাড়তেই থাকবে। তাই এখনই সময়—মৃত্যুর এই বাণিজ্যের বিপরীতে জীবনের পক্ষেই কঠোর ও দ্বিধাহীন রাষ্ট্রীয় অবস্থান গ্রহণের।
লেখক: সভাপতি, সেভ দ্য রিভার্স বাংলাদেশ সোসাইটি, চট্টগ্রাম।
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ফল প্রকাশের পর মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠে কয়েকটি সংখ্যা। কারও জন্য সেই সংখ্যা আনন্দের, কারও জন্য হতা...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : হাসপাতালের করিডোরে অপেক্ষমাণ স্বজনদের একটাই প্রার্থনা—প্রিয় মানুষটি যেন সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন। à...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গণমাধ্যমকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বৈষমà§...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে যেমন প্রকাশ করে, তেমনি মানুষের মানবিকতা, রাষ্ট্à...বিস্তারিত
আ.ন.ম. তাজওয়ার আলম : বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ইতিহাসে তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প একটà...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : বিধির পোশাকে তিনি শৃঙ্খলার প্রহরী এক দীপ্তিমান নাম, কাব্যের অলিন্দে জ্বালান তিনি মননের অনির্বাণ à...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited