শিরোনাম
আবদুল্লাহ মজুমদার : | ০৮:১০ পিএম, ২০২৬-০৯-০২
চট্টগ্রামের কোনো সড়ক দিয়ে হাঁটলে উন্নয়নের চিহ্ন চোখে পড়বে। কোথাও রাস্তা কাটা, কোথাও নালা সংস্কারের কাজ, আবার কোথাও বসানো হচ্ছে পানির পাইপ বা পয়োনিষ্কাশন লাইন। কিছুদিন পর দেখা যায়, মেরামত করা সেই রাস্তাই আবার কাটা হয়েছে। এক সংস্থা কাজ শেষ করে যাওয়ার পর আরেক সংস্থা এসে শুরু করেছে নতুন কাজ। উন্নয়ন হচ্ছে, অর্থ ব্যয় হচ্ছে; কিন্তু নাগরিকের ভোগান্তি কমছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে বাড়ছে।
প্রশ্ন হলো, একটি নগরে এত উন্নয়নকাজ চললেও সেগুলোর মধ্যে সমন্বয় করবে কে?
চট্টগ্রাম দেশের প্রধান বন্দরনগরী। অর্থনীতি, বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে এ শহরের গুরুত্ব অনেক। অথচ নগর ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ তিন প্রতিষ্ঠান—চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও চট্টগ্রাম ওয়াসার কাজের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দীর্ঘদিনের। প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব আলাদা হলেও কাজের ক্ষেত্র অনেক জায়গায় একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। একটি প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত তাই অন্যটির কাজকে প্রভাবিত করে। আর এর সরাসরি খেসারত দিতে হয় নগরবাসীকে।
সমস্যাটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে রাস্তায়
চসিকের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে নগরের রাস্তা, নালা, ফুটপাতসহ বিভিন্ন নাগরিক অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ। সিডিএ নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর ওয়াসার মূল দায়িত্ব পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা।
কিন্তু বাস্তবে ওয়াসাকে পাইপলাইন বসাতে চসিকের রাস্তা কাটতে হয়। সিডিএর পরিকল্পিত এলাকাতেও ওয়াসার অবকাঠামো স্থাপন করতে হয়। কাজ শেষে রাস্তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার প্রশ্নে আবার তৈরি হয় জটিলতা।
এর একটি বাস্তব উদাহরণ আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা। ওয়াসার পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে ওই এলাকার বেশ কয়েকটি সড়ক দীর্ঘ সময় কাটা অবস্থায় ছিল। কোনো কোনো সড়ক পুরোপুরি বন্ধও হয়ে যায়। এতে স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, অফিস ও আবাসিক এলাকার মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ তৈরি হয়।
প্রকল্পের কাজ প্রয়োজনীয়—এ নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাস্তা কাটার আগে এবং কাজ শেষে রাস্তা পুনরুদ্ধারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ছিল কি?
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে হালিশহরেও। রাস্তা কাটার অনুমতি, কাজের ধরন এবং রাস্তা পুনরুদ্ধার নিয়ে চসিক ও ওয়াসার মধ্যে বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য হয়েছে। ওয়াসার পক্ষ থেকে সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে। আবার চসিকের পক্ষ থেকে নিয়ম না মেনে রাস্তা কাটার অভিযোগও এসেছে।
সংস্থাগুলোর বক্তব্যে পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু নগরবাসীর প্রশ্ন একটাই—রাস্তা কাটা হয়েছে, এখন সেটি কবে ঠিক হবে?
জলাবদ্ধতা নিরসনে এত প্রকল্প, তবু প্রশ্ন
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যাও সমন্বয়হীনতার বড় উদাহরণ। বছরের পর বছর ধরে জলাবদ্ধতা নিরসনে নানা প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ভারী বৃষ্টি হলে নগরের বিভিন্ন এলাকায় পানি জমার চিত্র খুব একটা বদলায়নি।
সিডিএর বড় জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে ৩৬টি খাল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে ওয়াসার মাস্টারপ্ল্যানে ৫৭টি খালের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ দুটি পরিকল্পনার মধ্যে ২১টি খাল নিয়ে পার্থক্য রয়েছে।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে—একটি শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের পরিকল্পনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য ও পরিকল্পনার মধ্যে এতটা পার্থক্য কেন?
পানি তো চসিক, সিডিএ বা ওয়াসার সীমানা বোঝে না। যে পথ দিয়ে পানি নামার কথা, সেদিকেই নামবে। একটি খাল পরিষ্কার করা হলো, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত অন্য খাল বা নালা অকার্যকর থাকলে সুফল মিলবে না। তাই জলাবদ্ধতা নিরসন কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাজ হতে পারে না। প্রয়োজন পুরো নগরকে একটি সমন্বিত জলপ্রবাহব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা।
প্রকল্প আছে, সমন্বিত পরিকল্পনা কোথায়?
চট্টগ্রামে প্রকল্পের অভাব নেই। অভাব প্রকল্পগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের।
একই এলাকায় একাধিক সংস্থার কাজ চললেও কে কখন কাজ করবে, কোন কাজ আগে শেষ করতে হবে, রাস্তা কে পুনরুদ্ধার করবে এবং ভবিষ্যতে আবার একই রাস্তা কাটতে হবে কি না—এসব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর অনেক সময় পাওয়া যায় না।
ফলে একটি রাস্তা সংস্কারে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর আবার সেটি কেটে ফেলা হয়। পরে আবার মেরামতে অর্থ খরচ হয়। একই অবকাঠামোয় বারবার অর্থ ব্যয় করা শুধু নাগরিক ভোগান্তিই বাড়ায় না, সরকারি অর্থেরও অপচয় ঘটায়।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে চসিক মেয়র রাস্তা কাটার বিষয়ে ওয়াসার ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কতা দিয়েছিলেন। ওয়াসার পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল, রাস্তা কাটতে চসিকের অনুমতি প্রয়োজন এবং সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কাগজে-কলমে সমন্বয় থাকলেই কি মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন হচ্ছে?
দায় এড়ানোর সংস্কৃতি বন্ধ হোক
নগর ব্যবস্থাপনায় সমস্যা আরও বড় হয় যখন কোনো কাজের সাফল্যের কৃতিত্ব নিতে সবাই আগ্রহী থাকে, কিন্তু ব্যর্থতা বা ভোগান্তির দায় নিতে কেউ আগ্রহী নয়।
একটি রাস্তা কাটা হলো। কাজ শেষ হলো। রাস্তা ঠিক হলো না। তখন এক সংস্থা বলবে, অন্য সংস্থার কারণে কাজ করা যাচ্ছে না। অন্য সংস্থা বলবে, তাদের অনুমতি নেওয়া হয়নি। এভাবে দায় এক প্রতিষ্ঠান থেকে আরেক প্রতিষ্ঠানের দিকে ঠেলে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না।
নগরবাসী জানতে চায় না কোন প্রতিষ্ঠানের কতটা ক্ষমতা। তারা চায় চলাচলের উপযোগী রাস্তা, কার্যকর নালা, নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ এবং জলাবদ্ধতামুক্ত নগর।
সমাধান অসম্ভব নয়
চসিক, সিডিএ ও ওয়াসার মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয় কাঠামো জরুরি। শুধু সভা করে সিদ্ধান্ত নিলে হবে না; সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতাও থাকতে হবে।
একটি সমন্বিত প্রকল্প ক্যালেন্ডার করা যেতে পারে। কোনো এলাকায় রাস্তা সংস্কারের আগে আগামী কয়েক বছরে সেখানে পানি, পয়োনিষ্কাশন, গ্যাস, বিদ্যুৎ বা অন্য কোনো সংস্থার কাজ আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ভূগর্ভস্থ সব ইউটিলিটির একটি সমন্বিত ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করা দরকার। রাস্তা কাটার আগেই ঠিক করতে হবে—কাজ শেষে কে এবং কত দিনের মধ্যে রাস্তা পুনরুদ্ধার করবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জবাবদিহি। কোন প্রতিষ্ঠান রাস্তা কাটল, কেন কাটল, অনুমতি ছিল কি না, কাজ কত দিনে শেষ হওয়ার কথা এবং রাস্তা পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব কার—এসব তথ্য স্পষ্ট থাকা উচিত।
চট্টগ্রামবাসী উন্নয়ন চায়। তারা নতুন রাস্তা, উন্নত নালা, আধুনিক পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা এবং ভালো নগরসেবা চায়। কিন্তু তারা এমন উন্নয়ন চায় না, যেখানে একটি প্রতিষ্ঠানের কাজ করতে গিয়ে আরেক প্রতিষ্ঠানের তৈরি অবকাঠামো নষ্ট হয়।
আগ্রাবাদ, হালিশহর কিংবা জলাবদ্ধতা নিরসনের ৩৬ ও ৫৭ খালের হিসাব—সব ঘটনাই একই সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে। আর তা হলো সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনার ঘাটতি।
চট্টগ্রামের সংকট প্রকল্পের অভাবে নয়; বড় সংকট প্রকল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে।
এই শহরকে সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য করতে হলে নতুন প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে বেশি জরুরি—বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, দায়িত্ব স্পষ্ট করা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
উন্নয়নের নামে একই রাস্তা বারবার কেটে নগরবাসীকে ভোগান্তিতে ফেলা কোনোভাবেই টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা হতে পারে না।
সমন্বয়হীনতার এই খেসারত আর কত দিন দেবে চট্টগ্রামবাসী?
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনীতিক।
রাউজান প্রতিনিধি : : চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) শিক্ষার্থীদের যাতয়াতের সুবিধার্থে এবং পরিব...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : কাজী সরোয়ার খান মনজু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি আজ ৪৮ বছরে পদার্পণ করছে। ১৯৭৮ সালের ১ সে...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ভাত আমাদের খুব আপন। প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় তার উপস্থিতি এত স্বাভাবিক যে, ভাত নিয়ে আলাদা করে ভা...বিস্তারিত
রাউজান প্রতিনিধি : : রাউজানের মঙ্গলখালী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব হিসেবে সুদীর্ঘ ৫৪ বছর গ্রামের আপামর জনতার শ্রদ্ধ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দৈনিক আমাদের চট্টগ্রামের উদ্যোগে ‘সীরাতে মোস্তফা মাহফিল’ ...বিস্তারিত
আবদুল্লাহ মজুমদার : : ব্যাংকে টাকা আছে, কিন্তু প্রয়োজনের সময় সেই টাকা ব্যবহার করা যাচ্ছে না—এর চেয়ে বড় আর্থিক অনিশ্চয়ত...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited