চট্টগ্রাম   মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬  

শিরোনাম

রাজনীতির আলো-ছায়া ও বিতর্কিত উত্তরাধিকারের তোফায়েল আহমেদ

আবদুল্লাহ মজুমদার :    |    ০৫:৩১ পিএম, ২০২৬-০৬-০৩

রাজনীতির আলো-ছায়া ও বিতর্কিত উত্তরাধিকারের তোফায়েল আহমেদ

রাজনীতিতে কিছু জীবন থাকে, যা সময়ের সীমা ছাড়িয়ে একটি পুরো যুগের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়। আবার কিছু জীবন এমনও থাকে, যেখানে অবদান, বিতর্ক, ক্ষমতা ও প্রশ্ন—সব একসঙ্গে মিশে ইতিহাসকে জটিল করে তোলে। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তেমনই এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর দীর্ঘ পথচলা বাংলাদেশের রাজনীতির আলো-ছায়া, সংঘাত ও মেরুকরণের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার কোরালিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং ষাটের দশকের গণআন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানসহ তৎকালীন রাজনৈতিক উত্তাল সময়ের সক্রিয় অংশীদার হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে তিনি আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রভাবশালী নেতৃত্বে উঠে আসেন। সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং দলীয় নীতিনির্ধারক হিসেবে তিনি দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় ইতিহাসের ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘিরে তাঁর কঠোর অবস্থানের কারণে। বিশেষ করে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নিয়ে তাঁর বক্তব্য বারবার রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তিনি একাধিকবার মন্তব্য করেন যে, জিয়াউর রহমান বেঁচে থাকলে যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসনের দায়ে তাঁর বিচার হতে পারত। এই ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক উত্তেজনাকে শুধু বাড়ায়নি, বরং রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের ব্যাখ্যাকে আরও সংঘাতময় করে তুলেছে।

স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়েও তাঁর অবস্থান ছিল একরৈখিক ও অনমনীয়। তিনি ধারাবাহিকভাবে দাবি করেন যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে। স্বাধীনতার ঘোষণার প্রশ্নে তিনি ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যাকে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। এই অবস্থান দেশের ইতিহাস-রাজনীতিতে বিদ্যমান বিভাজনকে আরও গভীর করে তোলে এবং দীর্ঘদিনের বিতর্ককে নতুন করে উসকে দেয়।

জিয়াউর রহমানের শাসনামল সম্পর্কেও তাঁর সমালোচনা ছিল ধারাবাহিক ও তীব্র। তিনি অভিযোগ করেন, সে সময় ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বাসন ঘটে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রাষ্ট্রীয় নীতিতে দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে বিরোধী রাজনৈতিক শিবির এই ব্যাখ্যাকে একপাক্ষিক রাজনৈতিক বয়ান হিসেবে অভিহিত করেছে, যেখানে ইতিহাসের জটিল বাস্তবতার চেয়ে দলীয় অবস্থানই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।

তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি বড় বিতর্ক ছিল ক্ষমতাসীন দলের দীর্ঘ শাসনামলে তাঁর দৃঢ় অবস্থান। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক বিরোধ দমনের অভিযোগ যেসব সময়ে উঠেছে, সেসব ক্ষেত্রে তিনি প্রায়ই ক্ষমতার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন। সমালোচকদের মতে, এই ধারাবাহিক অবস্থান তাঁকে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী নয়, বরং ক্ষমতার কাঠামোর এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত করে।

এই প্রেক্ষাপটে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নও বারবার উঠেছে। তিনি কি রাষ্ট্রীয় রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন, নাকি ক্ষমতার কেন্দ্রকে আরও সুসংহত করেছেন—এই বিতর্ক তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি স্থায়ী অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমালোচকদের মতে, তাঁর অবস্থান অনেক সময় বিরোধী রাজনৈতিক কণ্ঠকে দুর্বল করেছে এবং রাজনৈতিক মেরুকরণকে তীব্র করেছে।
দুর্নীতির অভিযোগও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিতর্কিত অধ্যায়ের অংশ হিসেবে আলোচিত হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে একটি মামলায় তাঁর নাম ওঠে, যদিও বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় চললেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। তবে অভিযোগের এই অনিশ্চয়তা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিতর্ককে আরও দীর্ঘায়িত করেছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর নাম ঘিরে আরও কিছু বিতর্কও দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়েছে।

বিশেষ করে শহীদ আবদুল মালেক হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গে এনায়েত উল্লাহ আব্বাসীসহ কয়েকজন আলোচক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বিভিন্ন সময়ে তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তবে এ বিষয়ে কোনো বিচারিক রায় বা সর্বজনস্বীকৃত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক অভিযোগ ও বিতর্কের পরিসরেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তবু এই আলোচনা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিতর্কিত উত্তরাধিকারের অংশ হিসেবে বারবার ফিরে এসেছে।

সমর্থকেরা তাঁর সংগঠন দক্ষতা, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং ভোলা অঞ্চলের উন্নয়নমূলক ভূমিকার কথা উল্লেখ করলেও সমালোচকদের মূল্যায়ন ভিন্ন। তাঁদের মতে, জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা ছিল মূলত দলীয় অবস্থান রক্ষা এবং ক্ষমতার কাঠামোকে শক্তিশালী করার দিকে বেশি কেন্দ্রীভূত। এই কারণে তিনি অনেক সময় রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতার পরিবর্তে ক্ষমতার রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ হিসেবেই বেশি চিহ্নিত হয়েছেন।

২০২৬ সালের ১ জুন রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় তিনি ভুগছিলেন। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটালেও তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে বিতর্ক ও মূল্যায়নের দ্বন্দ্ব এখনো শেষ হয়নি।

ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিকে একক কোনো রঙে রাঙায় না; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতরের আলো-অন্ধকার উন্মোচিত হয়। তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনও তেমনই এক বহুমাত্রিক বাস্তবতা—যেখানে অবদান ও বিতর্ক পাশাপাশি অবস্থান করে, কিন্তু বিতর্কই বেশি জোরে কথা বলে। ফলে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কোনো একক ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা বাংলাদেশের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির দীর্ঘ, জটিল ও বিভাজিত ইতিহাসেরই এক গভীর প্রতিচ্ছবি।

লেখক: সভাপতি, লাভ বাংলাদেশ পার্টি, চট্টগ্রাম মহানগর।

রিটেলেড নিউজ

মেয়াদ ফুরাল, নির্বাচন হলো না

মেয়াদ ফুরাল, নির্বাচন হলো না

আবদুল্লাহ মজুমদার : : চট্টগ্রাম নগরীর রাস্তায় প্রতিদিনের যানজট, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, বর্জ্যের স্তূপ আর নাগরিক দুর্ভোগের ম...বিস্তারিত


রাঙামাটিতে বিশেষ অভিযান: মাদক কারবারি ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগে আটক ১২

রাঙামাটিতে বিশেষ অভিযান: মাদক কারবারি ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগে আটক ১২

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি : : রাঙামাটিতে কোতয়ালী থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে মাদক কারবারি, মাদকসেবী, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযà...বিস্তারিত


সড়ক দুর্ঘটনায় আর কত প্রাণ গেলে টনক নড়বে? নিরাপদ সড়কের দাবি দেশজুড়ে

সড়ক দুর্ঘটনায় আর কত প্রাণ গেলে টনক নড়বে? নিরাপদ সড়কের দাবি দেশজুড়ে

মো.আরফান উদ্দীন  : পৃথিবীর আর কোন দেশে বাংলাদেশের মতো প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় এত মানুষের প্রাণহানি ঘটে কি না, তা আমার...বিস্তারিত


মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: নীরব কূটনীতি, অনুত্তরিত প্রশ্ন ও রাষ্ট্রের দায়

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: নীরব কূটনীতি, অনুত্তরিত প্রশ্ন ও রাষ্ট্রের দায়

আবদুল্লাহ মজুমদার : : একটি মৃত্যুদণ্ডের খবর কখনো কখনো একটি পরিবারের শোকের সীমানা ছাড়িয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধকেই কাঠগà§...বিস্তারিত


লায়ন্স ও লিও ক্লাব অব চিটাগং কর্ণফুলী এলিটের উদ্যোগে দিনব্যাপী সেবামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত

লায়ন্স ও লিও ক্লাব অব চিটাগং কর্ণফুলী এলিটের উদ্যোগে দিনব্যাপী সেবামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত

আমাদের ডেস্ক : : লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল, জেলা ৩১৫-বি৪, বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগং কর্ণফুলী এল...বিস্তারিত


বরেণ্য কবি নূরুল হকের সাথে লায়ন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের সৌজন্য সাক্ষাৎ

বরেণ্য কবি নূরুল হকের সাথে লায়ন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের সৌজন্য সাক্ষাৎ

আমাদের ডেস্ক : : কবিতা, সাহিত্য এবং আন্তর্জাতিক সাহিত্য বিনিময়ে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানজনক সার্...বিস্তারিত



সর্বপঠিত খবর

মন্ত্রণালয়ের আদেশ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিডিএ-তে শিকড় গেঁড়েছেন হারুন!

মন্ত্রণালয়ের আদেশ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিডিএ-তে শিকড় গেঁড়েছেন হারুন!

নিজস্ব প্রতিবেদক : ​সরকারি আদেশ মানেই যেন মগের মুল্লুক! গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট বদলি আদেশকে তোয়াক্কা নà¦...বিস্তারিত


নেশনস কাপের ফাইনালে মুখোমুখি সালাহ-মানে

নেশনস কাপের ফাইনালে মুখোমুখি সালাহ-মানে

স্পোর্টস ডেস্ক : : ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের জায়ান্ট লিভারপুলের জার্সিতে খেলেন দুজনেই। আক্রমণভাগে দুজনের রসায়নে অলরেড...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর