শিরোনাম
স্টাফ রিপোর্টার : | ০৮:৩২ পিএম, ২০২৬-০৪-২৯
মাতামুহুরী নদীর তীরঘেঁষা চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের পুলের ছড়া এলাকায় তামাকপাতার আঁটির ওপর বসে আছে আট বছরের এক শিশু। সামনে সদ্য কাটা তামাকপাতার স্তূপ। এ সময় তার থাকার কথা শ্রেণিকক্ষে। কিন্তু তামাক কাটার মৌসুমে স্কুলে যাওয়া হয় না তার। বাবার সঙ্গে খেতে গিয়ে পাতা কাটা, আঁটি বাঁধা আর চুল্লিতে নিয়ে যাওয়া—এটাই তখন তার প্রতিদিনের কাজ।
সম্প্রতি এলাকাটিতে কথা হয় শিশুটির সঙ্গে। সে বলে, ‘তামাক কাটার সময় স্কুলে যাই না। বাবার সঙ্গে তামাকপাতা কাটি।’ শিশুটির বাবা জানান, শ্রমিক ভাড়া করার সামর্থ্য না থাকায় ছেলেকে সঙ্গে নিতে হয়। স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে জানেন, তবু বিকল্প নেই। অবশ্য এই শিশু কেবল নয়, একইভাবে এলাকার অনেক শিশুকেই তামাকের মৌসুমে এভাবেই পরিবারকে সহায়তা করতে হয়।
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার অন্তত ১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশপাশে তামাক চাষ ও তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ চলছে; সেই পরিবেশেই পড়াশোনা করছে শিক্ষার্থীরা। অর্থাৎ এসব বিদ্যালয়ের চারপাশজুড়ে তামাকখেত, আশপাশে অসংখ্য তামাকচুল্লি। ফলে প্রতিদিনই শিশুরা বইয়ের পাশাপাশি শ্বাস নিচ্ছে দূষিত বাতাসে। এ কারণে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
তামাক চাষে ব্যবহৃত কীটনাশক শিশুদের স্নায়ুতন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কম বয়সে এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শে এলে দীর্ঘ মেয়াদে শারীরিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মোহাম্মদ জায়নুল আবেদীন, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, চকরিয়া
সম্প্রতি সরেজমিন কাকারা, ফাঁসিয়াখালী, বমু বিলছড়ি, বরইতলী ও সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন বিদ্যালয় ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে। কোথাও শ্রেণিকক্ষের দেয়াল ঘেঁষে তামাকখেত, কোথাও বিদ্যালয়ে ঢোকার পথের দুই পাশে বিস্তৃত চাষ।
কাকারা ইউনিয়নের ডা. গোপাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঢোকার মুখেই তামাকখেত। ফাঁসিয়াখালীর পুকপুকুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের বড় রাস্তার দুই পাশে তামাকখেত। বমু বিলছড়ির নাজমা ইয়াছমিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রায় তিন দিক থেকেই তামাকের মধ্যে আটকে গেছে। কোথাও কোথাও মনে হয়, তামাকখেতের মাঝখানেই বসে পাঠ নিচ্ছে শিশুরা।
এই ১৯টি বিদ্যালয়ের আশপাশে অন্তত শতাধিক তামাকচুল্লিতে পাতা শুকানো হচ্ছে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার হিসাবে, শুধু এসব বিদ্যালয় ঘিরেই রয়েছে অন্তত ১১০টি চুল্লি। ডা. গোপাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আমেনা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, তামাকপাতা পরিপক্ব হলে তার তীব্র গন্ধ শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আবার তামাক কাটার সময় অনেক শিক্ষার্থী পরিবারের সঙ্গে কাজে যুক্ত হয়। এতে তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
শিশুদের শরীরে ঢুকছে অদৃশ্য বিষ
বিদ্যালয়ে যেতে হলে শিশুদের পেরোতে হচ্ছে তামাকখেত। খালি পায়ে বা স্যান্ডেল পরে তারা মাড়িয়ে যায় কীটনাশক ছড়ানো জমি। তামাকপাতা ছোঁয়া, আবার অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সঙ্গে খেতে কাজ করা—সব মিলিয়ে শৈশব থেকেই তারা সরাসরি সংস্পর্শে আসছে বিষাক্ত উপাদানের।
২২ এপ্রিল সকালে উত্তর কাকারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয় থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে দুটি তামাকচুল্লি। চলছে পাতা প্রক্রিয়াজাত করার কাজ। চুল্লি থেকে বের হওয়া উৎকট গন্ধ বাতাসে ভেসে সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। শ্রেণিকক্ষের ভেতরেও সেই গন্ধ টের পাচ্ছিলেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকেরা জানান, এটি কোনো একদিনের ঘটনা নয়; তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় নিয়মিত বিরতিতেই এই গন্ধ ভেসে আসে।
চিকিৎসকদের মতে, এই সংস্পর্শের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে ধরা না পড়লেও শরীরের ভেতরে ধীরে ধীরে ক্ষতি তৈরি করে। চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জায়নুল আবেদীন বলেন, তামাকপাতার মধ্যে থাকা নিকোটিন ত্বকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এ অবস্থাকে ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’ বলা হয়। এতে বমি, মাথা ঘোরা ও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
তিনি আরও জানান, তামাক চাষে ব্যবহৃত কীটনাশক শিশুদের স্নায়ুতন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কম বয়সে এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শে এলে দীর্ঘ মেয়াদে শারীরিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
পরিবেশ ও কৃষিতে পড়ছে চাপ
তামাক চাষের প্রভাব শুধু মানুষের শরীরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর প্রভাব পড়ছে পরিবেশ ও কৃষিতেও। মাতামুহুরী নদীঘেঁষা এলাকায় তামাক চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বৃষ্টির পানি ও সেচের মাধ্যমে নদী ও জলাশয়ে মিশে যাচ্ছে। এতে জলজ প্রাণীর ওপর প্রভাব পড়ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ।
তামাক চাষের প্রভাব পড়ছে পাশের জমির ওপরও। সুরাজপুর চরের কৃষক আলী আহমদ জানান, তামাকখেতের পাশে তাঁর বাদামের জমিতে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আগে একটি গাছে প্রায় ২৫০ গ্রাম বাদাম পাওয়া গেলেও এখন তা নেমে এসেছে ১০০ গ্রামের কাছাকাছি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানাজ ফেরদৌসী বলেন, তামাক চাষে তুলনামূলক বেশি মাত্রায় রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যা মাটির জৈব গঠন নষ্ট করে। দীর্ঘদিন এভাবে চাষ চললে জমির উর্বরতা শক্তি কমে যায় এবং খাদ্যশস্য উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, ধান বা সবজির মতো ফসলের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি ও বাজার অনিশ্চিত। তার বিপরীতে তামাক চাষে কোম্পানিগুলো আগাম অর্থ, বীজ ও উপকরণ দেয়, ফলে চাষিরা নিশ্চিত আয় পান।
কাকারা এলাকার কৃষক মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, ‘তামাক চাষে লাভ নিশ্চিত। অন্য ফসলে খরচ উঠে আসবে কি না, সেই অনিশ্চয়তা থাকে। তাই অনেকেই বাধ্য হয়ে তামাকের দিকে ঝুঁকছেন।’
তদারকির অভাব, দায় কার
পরিবেশকর্মীদের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে তামাক চাষ ও চুল্লি স্থাপন বন্ধে কার্যকর তদারকি নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগের আশ্বাস থাকলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
আইনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে তামাক নিয়ন্ত্রণের কথা থাকলেও বাস্তবে বিদ্যালয়ের দেয়াল ঘেঁষে তামাকখেত কীভাবে টিকে থাকে, এই প্রশ্ন তুলছেন অভিভাবকেরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন অভিভাবক বলেন, শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশের ক্ষতি; এসব কারও অজানা নয়। তবু কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই।
তবে বিদ্যালয়ের পাশে তামাক চাষ দ্রুত বন্ধ করা উচিত বলে মনে করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ। তিনি বলেন, চকরিয়ায় হাজারের বেশি একর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে, যার একটি বড় অংশ ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে। ফলে যে জায়গাটি শিশুদের নিরাপদ শেখার পরিবেশ হওয়ার কথা, সেটিই হয়ে উঠছে ঝুঁকির কেন্দ্র।
জানতে চাইলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মহিউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ারও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
মীরসরাই প্রতিনিধি : : মীরসরাই উপজেলা প্রশাসনে নতুন নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে ২৭ অক্টোবর (মঙ্গলবার) দুপুরে যোগদান করে...বিস্তারিত
আনোয়ার হোসেন ফরিদ, ফটিকছড়ি : : চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে মোবাইল টাওয়ারের ব্যাটারি চুরির চেষ্টার অভিযোগে পাঁচজনকে আটক করেছে পুলিশে...বিস্তারিত
বোয়ালখালী প্রতিনিধি : : আলমগীর রানা : চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে প্রায় ৪০০ দাবাড়ুর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সফলভাবে সম্পন্ন ...বিস্তারিত
আনোয়ার হোসেন ফরিদ, ফটিকছড়ি : : চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও সম্প্রীতির আবহে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধাà...বিস্তারিত
আনোয়ার হোসেন ফরিদ, ফটিকছড়ি : : চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার নাজিরহাট পৌরসভার শাহ সোবাহানিয়া সড়কের উন্নয়ন কাজে নিম্নমানের ইট à¦...বিস্তারিত
স্টাফ রিপোর্টার : : বান্দরবানের আলীকদমে দুর্গম সীমান্ত এলাকার চিকিৎসাবঞ্চিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের পাশে দাঁড়িয়...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik amader Chattagram | Developed By Muktodhara Technology Limited