শিরোনাম :


বিষয় :

অবৈধ গর্ভপাতে অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তানের জন্ম, ঠাঁই ময়লার ভাগাড়ে


১৮ মে, ২০২৪ ২:০২ : অপরাহ্ণ

স্টাফ রিপোর্টার : নগরের খুলশী থানাধীন পূর্ব নাসিরাবাদে ১৪ মে সন্ধ্যা সাতটার দিকে ময়লার ভাগাড় থেকে দুটি মানবভ্রূণ উদ্ধার করে খুলশী থানা পুলিশ। ১০ মে রাত ১১টার দিকে বোয়ালখালীর গোমদন্ডী স্টেশন সংলগ্ন রেললাইনের পাশে কান্নারত কন্যাশিশুকে উদ্ধারের পর পটিয়ার নিঃসন্তান এক দম্পতির হাতে তুলে দেওয়া হয়।
২৬ এপ্রিল বিকাল ৩টার দিকে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের নিচের ডাস্টবিন থেকে একটি মানবভ্রূণ উদ্ধার করে চান্দগাঁও থানা পুলিশ।
এর আগে ৭ এপ্রিল সকালে খাগড়াছড়ি পৌরসভা সংলগ্ন পাবলিক টয়লেটের সামনে পরিত্যক্ত ঘরে কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
১৬ এপ্রিল রাত ৮টার দিকে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শৌচাগারে ফেলে যাওয়া নবজাতককে উদ্ধার করেন একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী।
২০১৬ সালের ২৯ মে বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা মো. ইব্রাহিম খান মাসুদকে (৩৪) স্ত্রীর গর্ভের ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে কারাগারে পাঠায় চট্টগ্রাম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। মাসুদ ও তার পরিবার ২০ লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে ২০১৫ সালের ১৫ জুন রাতে জোর করে গর্ভপাতের ওষুধ খাওয়ান বলে দাবি ভুক্তভোগীর আইনজীবীর। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২০২১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে স্বামী রাঙ্গুনিয়ার হোসনাবাদ এলাকার কাজী সফিউল আলমের বিরুদ্ধে মামলা করেন স্ত্রী। মামলার অভিযোগে বলা হয়, পারিবারিকভাবে বিয়ের পর অন্তঃসত্ত্বা হলে জ্বর-সর্দির ওষুধ খাওয়ানোর কথা বলে গর্ভপাত করানো হয়।
২০১৭ সালে একুশের প্রথম প্রহরে সবাই যখন একুশ উদযাপনে ব্যস্ত, তখন নবজাতকের কান্নার শব্দ শুনতে পান পথচারীরা। কর্ণেলহাট এলাকার লাইফ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার সংলগ্ন ড্রেনে ফেলে দেওয়া হয়েছিল পরবর্তীতে নাম পাওয়া ‘একুশ’-কে। ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারি সকালে বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় আবর্জনা কুড়াতে গিয়ে ময়লার স্তূপে জুতার বাক্সবন্দি কন্যা শিশুকে কান্নার শব্দ শুনে উদ্ধার করে কয়েকজন পথশিশু। ২০২৩ সালের ২৬ মে দুপুর আড়াইটার দিকে দেওয়ানহাট ব্রিজের নিচে ডাস্টবিন থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় দুই বছর বয়সী এক শিশুকে উদ্ধার করা হয়। শিশুটির মধ্যে প্রতিবন্ধীতার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ায় পরিবার তাকে সেখানে ফেলে যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
চিকিৎসার নামে অবৈধ গর্ভপাত ব্যবসা চালিয়ে আসছিল নগরের চট্টেশ্বরী সড়কের বেসরকারি সিটি হেলথ ক্লিনিক। চিকিৎসকের বদলে নার্স দিয়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গর্ভপাত করানো হতো সেখানে। ২০২০ সালের জুন মাসে গর্ভপাত করাতে গিয়ে এক কলেজ ছাত্রীর মৃত্যু হয় ওই ক্লিনিকে। কিন্তু ছাত্রীর অভিভাবকের কাছে তারা বিষয়টি গোপন রেখে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে মৃত্যু হয়েছে বলে প্রচার চালায়। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলা তদন্তে নেমে পুলিশ মৃত্যুর রহস্য উদঘাটন করে। ৬ মাস পর অভিযান চালিয়ে ক্লিনিকটি বন্ধ করে দেওয়া হয়, গ্রেফতার করা হয় ক্লিনিকের মালিক-নার্সসহ ৫ জনকে।
নগরের বাকলিয়ার বউবাজারের সুবর্ণ আবাসিক এলাকায় ধাত্রীবিদ্যার সনদধারী দাবি করে ফাহিমা নামের এক নারী স্বামীকে নিয়ে খুলে বসেন ‘নিরাপদ প্রসব সেন্টার’ নামের ক্লিনিক। সেখানে ফাহিমা নিজেই করতেন অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অপারেশন। ২০২৩ সালের ১৩ জানুয়ারি প্রসব করানোর সময় এক নারীর মৃত্যু হলে প্রশাসন এই ক্লিনিক সম্পর্কে জানতে পারে। এরপর ২৫ জানুয়ারি জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত ক্লিনিকটি বন্ধ করে দেয়।
এভাবেই অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিকে অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তান জন্মের পর ঠাঁই হচ্ছে ময়লার ভাগাড়ে, নালায়, ব্যাগে বন্দি অবস্থায় রাস্তার পাশে, ঝোপঝাড়, শৌচাগারে। উদ্ধার হওয়া নবজাতকের বেশিরভাগই অপরিণত ও মৃত।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর থেকে অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকের তালিকা সম্বলিত চিঠি ১১ জেলার সিভিল সার্জনের কাছে পাঠানো হয়। তালিকায় ১১৮টি হাসপাতাল লাইসেন্সবিহীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। জেলায় স্বাস্থ্যসেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫৮০টিরও বেশি। তবে জেলা ও উপজেলায় অবৈধভাবে চলমান হাসপাতাল-ক্লিনিকের সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে মত ভুক্তভোগীদের।
গর্ভপাত করাতে গিয়ে কত নারীর মৃত্যু হয়, তার সঠিক পরিসংখ্যান মিলে না। কারণ দেশের আইনে গর্ভপাত দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে দণ্ডবিধিতে (ধারা ৩১২-৩১৬) উল্লেখ আছে, শুধু মায়ের জীবন রক্ষার প্রয়োজনে গর্ভপাত করানো যেতে পারে। অর্থাৎ, গর্ভধারণ অব্যাহত থাকলে যদি মায়ের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে মায়ের জীবন রক্ষায় গর্ভপাত করানো যায়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গুতম্যাকার ইনস্টিটিউট এর জরিপ মতে, দেশে দৈনিক গড়ে স্বপ্রণোদিত গর্ভপাতের (স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে কিছু গর্ভপাত আপনা আপনি হয়, কিছু গর্ভপাত গর্ভবতীর ইচ্ছায় করানো হয়) সংখ্যা ৩ হাজার ২৭১টি। ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ১ হাজার নারীর মধ্যে ২৯ জন স্বপ্রণোদিত গর্ভপাত করান। এ ধরনের গর্ভপাতের হার চট্টগ্রাম বিভাগে ১ হাজার নারীর মধ্যে ১৮ জন। গর্ভপাত করানোর পর প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন নারী স্বাস্থ্য জটিলতার শিকার হন।
চট্টগ্রাম জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, করোনা পরবর্তী সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বেড়েছে। জন্মহার শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বেশি। ২০২৩-২৪ সালে প্রজনন হার ২.৬, নবজাতকের মৃত্যুহার প্রতি হাজারে ১৬ জন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে অনিচ্ছাকৃত গর্ভপাতের হার ছিল ৭.৫৫ শতাংশ। এছাড়া ইচ্ছাকৃত গর্ভপাতের হার ২.১২ শতাংশ।
গাইনোকোলজিস্টরা বলছেন, মাসিক বন্ধ হয়ে গেলে সেটা নিয়মিত করার এক ধরনের চিকিৎসার নাম ‘এমআর’। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গর্ভধারণের কারণেই মাসিক বন্ধ হয়৷ আগে এমআর করার সর্বোচ্চ সময়সীমা ছিল ৮ সপ্তাহ, কিন্তু এখন ১২ সপ্তাহ৷ সরকারি হাসপাতালেই এমআর এর আলাদা বিভাগ আছে৷ কিছু প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বৈধভাবেই এমআর করা হয়৷ তবে মানহীন কতিপয় হাসপাতাল ও ক্লিনিকে গর্ভপাতের যে ব্যবসা গড়ে উঠেছে, তা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, সেখানে প্রশিক্ষিত ডাক্তার ছাড়াই নার্স বা আয়া দিয়েই গর্ভপাতের কাজ করা হচ্ছে। ফলে গর্ভবতী ও নবজাতকের মৃত্যু হচ্ছে। কিছু এনজিও তাদের ক্লিনিকেও এমআর করাচ্ছে৷ অথচ এখন সার্জারি ছাড়া ওষুধের মাধ্যমেও গর্ভপাত করানো যায়৷
সাধারণত অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ এড়াতে অনেকে অবৈধ ক্লিনিকে এমআর করাতে আসেন৷ তাদের বড় একটি অংশ বয়সে তরুণী। যারা আসেন তারা বিষয়টি গোপন রাখতে চান। কেউ পরিবারের সদস্যদেরও জানাতে চান না। কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের নিয়েই আসেন। তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নেয় ক্লিনিক ব্যবসায়ীরা।
প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সোমা চৌধুরী বলেন, দেশে মাতৃমৃত্যুর একটি কারণ অনিরাপদ গর্ভপাত। অনেক ক্ষেত্রেই জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঘটনা ঘটে৷ অনেকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় সন্তান নিতে চান না। কিন্তু গর্ভধারণ হলে তারা এমআর করাতে চান। এছাড়া সচেতনতার অভাব, জবরদস্তি ও প্রতারণা-প্রলোভনের কারণেও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঘটনা ঘটছে। আমরা কাউন্সেলিং করে মাকে এমআর থেকে বিরত রাখি।

আরো সংবাদ