ই-পেপার | শুক্রবার , ৯ ডিসেম্বর, ২০২২
×

গণমাধ্যম বিবর্তন উন্নয়নের ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভিত্তি

মুদ্রণ যন্ত্রের আবিষ্কারের পর মানব সভ্যতার নবজাগরণের সূচনা হয়েছে। এ নব জাগরণ এগিয়ে নিয়েছে মানুষ, সমাজ, দেশ আধুনিক বিশ্ব ব্যবস্থাকে । সভ্যতার উৎকর্ষ সাধনে আন্ত-সম্পর্ক ,সামাজিক সম্পর্ক এবং আন্তজার্তিক সম্পর্কে তথ্য প্রবাহের মাধ্যমে উন্নত ও শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলেছে । বিজ্ঞানের আবিষ্কারের তথ্য প্রবাহের মাধ্যমে মানব সভ্যতাকে অন্যান্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে । সমাজ ব্যবস্থা থেকে মানবধিকার, চিন্তা বুদ্ধিভিত্তিক চিন্তা, চিন্তা-ভাবনা, বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনের তথ্য মানুষের জীবনে এক বিপ্লব সৃষ্টি করেছে। গণমাধ্যমের কল্যাণে মানুষের জীবনে এসেছে উন্নত জীবন ব্যবস্থা, আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা । গণমাধ্যম সমাজ ও নাগরিকদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে । সাংবাদিকতা গণতন্ত্রের জন্য একটি মৌলিক শক্তি। এই মাধ্যম ডিজিটাল গল্প বলার শক্তি, গভীর অনুসন্ধানের মাধ্যমে ভবিষ্যতের একটা ধারণা দেওয়ার কাজ করে ।

গণমাধ্যম

বিশ্বব্যাপী মত প্রকাশের স্বাধীনতা সর্বজন স্বীকৃত । বর্তমান বিশ্বে মিডিয়ার স্বাধীনতা প্রায় প্রতিটি দেশে সংবিধান স্বীকৃত। আর যেখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই, সেখানে স্বৈরতন্ত্র বিদ্যমান বলে মনে করা হয়। আর এ মত প্রকাশের অধিকতর শক্তিশালী ভিত্তি গণমাধ্যম। সাংবাদিকতা নাগরিকের সম্মানজনক লক্ষ্য পূরণের জন্য কার্যক্রম পরিচালনা করে। এটি সম্পূর্ণরূপে বুদ্ধিভিত্তিক চিন্তা প্রতিফলনের মাধ্যমে । নাগরিকের সাথে রাষ্ট্রের এবং জনগনের একটি যোগসূত্র তৈরি করে দেয় । রাষ্ট্র পরিচালনায় পথ রচনা করে দেয় । তাই গণমাধ্যমকে আধুনিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়ে থাকে । সংবাদিকতা একটি উন্মুক্ত ক্ষেত্র । আমরা কী বিষয়ে চিন্তা করি তা শেয়ার করার, আলোচনা করার, শেখার এবং কথা বলার মাধ্যম । তাই গণমাধ্যম রাষ্ট্রের দর্পণ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

গত পাঁচ দশকে গণমাধ্যমের প্রভাব দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে । ফলে সাংবাদিকতা স্বচ্ছ ,সঠিক এবং মানুষের কাছে বস্তুনিষ্ঠ হিসেবে কাজ করে থাকে । যে কোন সাংবাদিকই জানেন, তার সবচেয়ে মৌলিক বাধ্যবাধকতা সত্যের প্রতি। সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা লক্ষ্য এবং দায়িত্ব। সত্যকে আইনের মতো বোঝা যায় না, সেজন্য একটি অর্থপূর্ণ প্রসঙ্গকে যাচাইযোগ্য করে ,তথ্যকে উপস্থাপন করে থাকে। যা বিতর্ককে সহজতর করার লক্ষ্য হিসেবে কাজ করে এবং শেষ পর্যন্ত ভাল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়।

অনেক সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন, অর্থনীতি থেকে শুরু করে বিনোদন এবং রাজনীতি থেকে সৌন্দর্য সবকিছুই এখন গণমাধ্যমের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে । নেতিবাচক বা ইতিবাচক উভয়ই হতে পারে।

যাই হোক ,সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার চ্যালেঞ্জগুলির সমস্ত উত্তর যদিও নেই তার পথকে সহজতর করে দেওয়া । অর্থবহ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে, বিশ্বাসকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে সুদূরপ্রসারী কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসার কাজ করে থাকে। আধুনিক সময়ে কিছু গণমাধ্যম ব্যক্তি এবং শ্রোতা, দর্শকের কর্ম পদ্ধতি এবং চিন্তা-ভাবনার উপর ভিত্তি করে সংবাদ এবং অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিজস্ব একটা প্রভাব বলয় তৈরি করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ।

ফলে সমাজে গণমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাবগুলি মানুষকে দারিদ্র্য, অপরাধ, নগ্নতা, সহিংসতা, নেতিবাচক মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ব্যাধি এবং অন্যান্য গুরুতর পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া গুজব থেকে দূরে সরে গিয়ে নিরপরাধীদের মারধর, বর্ণবাদী বিদ্বেষের মাধ্যমে দ্বন্দ্ব ইত্যাদি ।

সংবাদ কখনো কোন জাতি ,গোষ্ঠির বিরুদ্ধে বিদ্বেষের ভাষা হতে পারে না। তেমনি গণমাধ্যমও বিদ্বেষের উর্বর ভূমি হিসেবে থাকতে পারে না । তাই যারা সংবাদ সংগ্রহ করে , তারা যেন নিরট সত্যকে উপস্থাপন করে। এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি। কারণ কোন মানুষের প্রতি অমূলক বিদ্বেষ, বর্ণ বিদ্বেষ, মানবতার জন্য দুঃখজনক এবং অকল্যাণকর ।

বিল কোভাচ ও টম রোসেন্টিয়েল দ্য এলিমেন্টস অব জার্নালিজম গ্রন্থে বলেছেন , ‘আ প্র্যাকটিক্যাল অ্যান্ড ফাংশনাল ফর্ম অব ট্রুথ’—বাস্তব এবং কার্যকর সত্য। এ সত্যের ভিত্তি হচ্ছে পেশাদারিত্বের সাথে তথ্য-উপাত্ত ও ঘটনার বিবরণ সংগ্রহ এবং তা যাচাই করা।

সাংবাদিকতা কেবল তথ্য-উপাত্ত ও ঘটনার বিবরণ সংগ্রহের পেশা নয়, তথ্য যাচাই করাও এটির ভিত্তি । এর বাহিরে গিয়ে কিছু গণমাধ্যমকে ব্যক্তি ,গোষ্ঠি কিংবা সাম্রাজ্যবাদীদের হাতিয়ার হিসেবে সংবাদিকতাকে ব্যবহার করছে । যা ১৮৮৩ সালে নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডের প্রখ্যাত সাংবাদিক জোসেফ পুলিৎজারের হলুদ সাংবাদিকতাকে হার মানিয়েছে ,যা কাম্য নয় ।

এর ফলে পাঠক, দর্শকের মাঝে ব্যাপক বিতর্ক এবং চরম বিদ্বেষ ছড়ায়। যা একটি জাতি ,গোষ্ঠিকে উগ্রবাদের দিকে ধাবিত করে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে । এটা আয়নার টুকরোগুলোকে মানব চলাচলের রাস্তায় ছড়িয়ে দেওয়ার মত। দ্বিতীয়ত সিটিজেন সাংবাদিকতা , মোবাইল সাংবাদিকতা পেশাদারিত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছে । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আরো বেশি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে । বস্তুনিষ্ঠতা, নিরেপক্ষতা, স্বাধীনতা, সামাজিক মূল্যবোধকে স্বীকৃতি আরো বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।

গণমাধ্যমের ভূমিকাকে পলিসিগতভাবেও বির্তক সৃষ্টি করা উচিত হবে না । এর সঙ্গে উচ্চতর স্তরের মানবাধিকার বিষয় এবং সব ধরনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ও আছে । স্বাধীন গণমাধ্যম গণতন্ত্র, সুশাসন, আইনের শাসন ও জবাবদিহির প্রাণশক্তি । বিশ্বব্যাপী কতৃত্ববাদী শাসকরা সংবাদ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার নানা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ।

সংবাদ এবং গণমাধ্যম গণমানুষের ব্যাপক প্রভাব ফেলে । বিশেষ করে মানুষের আচার-আচরণ, সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এখন মানুষ বাস্তবচিত্রে সংবাদের পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করে।

রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, বিচারিক তদন্ত বিষয় নিয়ে ব্যক্তিগত মতামতের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার আইনকে অনুসরণ করা উচিত। সাংবাদিকতার নৈতিকতার ভিত্তিকে আরো চর্চা করা জরুরি । যাতে সংবাদ মাধ্যম গণমাধ্যম হয়ে উঠে । আঞ্চলিক ও ধর্মীয়, নির্দিষ্ট শ্রেণির অনুদাননির্ভর, রাজনৈতিক দাতাদের হাতিয়ার হিসেবে পরিচালিত যেন না হয় । বাক্‌স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার ও নাগরিক তথ্য অধিকার হরণকারী কলা কানুন মেনে চলা, পরিহার করা আবশ্যক । যাতে অভিজাত পক্ষের মতাদর্শকে প্রতিনিধিত্ব না করে।
লেখক,সাংবাদিক
মুহাম্মদ আমির হোছাইন
Amir.pciu6@gmail.com

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত রিপোর্ট