ই-পেপার | শুক্রবার , ৯ ডিসেম্বর, ২০২২
×

চট্টগ্রাম থেকে ‘৯৯৯’ এ ৯ মাসে ৬৮২৮ কল

চট্টগ্রাম থেকে মাসে ৬৮২৮ কল রেকর্ড করা হয়েছে ‘৯৯৯’ এ । চলতি বছরের ১৭ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড় এলাকায় এক তরুণীকে (২৬) রিকশা থেকে নামিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে কয়েকজন যুবক। এ অবস্থায় রিকশাচালক জাতীয় জরুরি সেবার ৯৯৯ নম্বরে কল করে বিষয়টি জানালে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বাকি তিন জন পালিয়ে যায়। পরে তাদেরও গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

চট্টগ্রামে পর্যটক উদ্ধারের ঘটনায়ও ছিল ৯৯৯-এর ভূমিকা। ঘটনাটি ঘটে ১৮ মার্চে। ৯৯৯ এ কল পেয়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পাহাড়ি ঝরনা দেখতে গিয়ে পথ হারানো চার পর্যটককে মধ্যরাতে গহিন পাহাড়ের জঙ্গল থেকে উদ্ধার পুলিশ। বরিশাল, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৭ জনের একটি পর্যটক দল আগের দিন (১৭ মার্চ) সীতাকুণ্ডে বেড়াতে আসেন। তারা পন্থিছিলা এলাকার পাহাড়ে অবস্থিত ঝরঝরি ঝরনা দেখতে একসঙ্গে পাহাড়ের ভেতর যান। পাহাড়ের পৌঁছানোর পর সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে এলে তাঁরা সেখানে রাত্রি যাপনের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে থাকা চার পর্যটক রাতের অন্ধকারে ঝরনায় যেতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেন। অন্য পর্যটকেরা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পরও চারজনের ফিরে না আসায় তারা চিন্তিত হয়ে পড়েন। এ সময় তারা গহিন পাহাড়ে পথ হারানোর বিষয়টি জানানোর পাশাপাশি উদ্ধারে সহায়তা পেতে ৯৯৯ এ ফোন করেন। এরপর বিষয়টি সীতাকুণ্ড থানা-পুলিশকে জানালে স্থানীয়দের সহায়তায় গহিন পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে পথ হারানো ৪ পর্যটকসহ ১৭ পর্যটককে উদ্ধার করা হয়।
গত ২৪ আগস্ট ইপিজেড থানার কাজির গলি চৌরাস্তা মোড় এলাকায় ৭ বছর বয়সী ছাত্রীকে ঘুম থেকে ডেকে মাদ্রারাসার একটি কক্ষে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন শিক্ষক মামুনুর রশিদ। পরে বিষয়টি শিশুটির পরিবার জেনে গেলে ৯৯৯ এ কল করে অভিযোগ জানায়। ওদিন বিকেলেই তাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।

শুধু এ দুটি ঘটনায় নয় ; ধর্ষণের এমন ঘটনাসহ নারী সহিংসতার ঘটনায় চলতি বছর চট্টগ্রাম থেকে ৯৯৯ এ কল করা হয়েছে ৩৫২টি। তাদের প্রত্যেকেই বিপদে পরে সহায়তা চেয়েছে ৯৯৯ এ এবং তাদের সমস্যার ধরণ বুঝে দেওয়া হয়েছে সহায়তাও।

মারামারি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, নারী নির্যাতন, অগ্নিকাণ্ডের মতো সকল ঘটনায় সহায়তা পেতে ‘৯৯৯’— কে বলা হয় বিপদে সহায়তার বন্ধু। তাই দেশের নাগরিকরা এখন যেকোনো বিপদেই প্রথমে ডায়াল করে ৯৯৯-এ। আর তাতেই সঙ্গে সঙ্গে মিলে জরুরী সহায়তাও। তেমনি সারাদেশের মতো চট্টগ্রাম থেকেও ৯৯৯-এ কল করে চাওয়া হয় নানাবিধ সমস্যার সমাধান। যাতে মিলে অগ্নিকাণ্ড থেকে শুরু করে নারী সহিংসতা-মারামারির মতো ঘটনার সহায়তা।

পুলিশের ৯৯৯ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী— চট্টগ্রাম থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর ; এই ৯ মাসে নানা সমস্যায় সেবা চাওয়া হয়েছে ৬ হাজার ৮২৮টি কলে।

তবে নারী সহিংসতার চেয়েও কল করে বেশি সেবা চাওয়া হয় মারামারির ঘটনায়। চট্টগ্রাম থেকে ৯৯৯-এ শুধু মারামারির ঘটনায় কল দেওয়া হয় ১৫১৫টি। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১৮৫টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৫৭টি, মার্চে ১৪৩টি, এপ্রিলে ১৭২টি, মে মাসে ২০২টি, জুনে ১৬৬টি, জুলাইয়ে ১৮৮টি, আগস্টে ১৭৪টি এবং সেপ্টেম্বরে ১২৮টি কল করা হয়।

এর পরে বেশি কল করা হয় জমি দখলের ঘটনায়। এ ঘটনায় কল দেওয়া হয় ৯৯০টি। এতে জানুয়ারিতে ১০২টি, ফেব্রুয়ারিতে ১২৭টি, মার্চে ১৩৯টি, এপ্রিলে ১২৬টি, মে মাসে ৯১টি, জুনে ৯৮টি, জুলাইয়ে ৮৭টি, আগস্টে ১০২টি এবং সেপ্টেম্বরে ১০৮টি কল করা হয় জাতীয় জরুরি সেবার (৯৯৯) নম্বরে।

জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর (৯৯৯) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জানুয়ারি মাসে ৭৫২টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ৬৩৮টি, মার্চ মাসে ১৩৯৫টি, এপ্রিল মাসে ৬৭০টি, মে মাসে ৬৭৬টি, জুন মাসে ৬৮১টি, জুলাই মাসে ৬৭৮টি, আগস্ট মাসে ৭১২টি এবং সেপ্টেম্বর মাসে ৬২৬টি।

জানুয়ারি মাসে ৭৫২ কল— জানুয়ারি মাসের ৭৫২ কলের মধ্যে মারামারি-জায়গা দখল সমস্যার কল বেশি। এতে মারামারির ঘটনায় ১৮৫টি, জায়গা দখলের ১১২টি, দুর্ঘটনার ৯২টি, অগ্নিকাণ্ডের ৮৪টি, জরুরি অগ্নিসেবার ৬৭টি, সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ৫৯টি, অভিযোগের ৪৮টি, পারিবারিক সমস্যার ৩৭টি, শব্দদূষণের ৩৫টি এবং নারী সহিংসতার ৩৩টি কল করে সেবা চাওয়া হয়।

ফেব্রুয়ারি মাসে ৬৩৮ কল— ফেব্রুয়ারি মাসেও মারামারি-জায়গা দখল সমস্যার কল বেশি। এ মাসে মারামারির ঘটনায় ১৫৭টি, জায়গা দখলের ১২৭টি, দুর্ঘটনার ৮৫টি, অগ্নিকাণ্ডের ৭৮টি, জরুরি অগ্নিসেবার ৬৩টি, সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ৫২টি, শব্দদূষণের ৪১টি, মেডিকেল সেবার ৩২টি, পারিবারিক সমস্যার ২৩টি এবং জুয়ার ঘটনায় ২১টি কল করা হয়।

মার্চ মাসে ১৩৯৫— মার্চ মাসে মারামারির ঘটনায় ১৪৩টি, জায়গা দখলের ১৩৯টি, অগ্নিকাণ্ডের ১২৯টি, দুর্ঘটনার ১২৫টি, জরুরি অগ্নিসেবার ১১১টি, সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ৭৩টি, নারী সহিংসতার ৪২টি, পারিবারিক সমস্যার ৩৩টি, শব্দদূষণের ৩৩টি, মেডিকেল সেবার ৩১টি কল করা হয়।

এপ্রিল মাসে ৬৭০ কল— এপ্রিল মাসে মারামারির ১৭২টি, জায়গা দখলের ১২৬টি, দুর্ঘটনার ৭৮টি, সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ৬০টি, জরুরি অগ্নিসেবার ৫৬টি, নারী সহিংসতার ৫৩টি, অগ্নিকাণ্ডের ৫১টি, পারিবারিক সমস্যার ৩৪টি, মেডিকেল সেবার ২৪টি এবং অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ১৬টি কল করা হয়।

মে মাসে ৬৭৬ কল— মে মাসে মারামারি ২০২টি, দুর্ঘটনার ১০৭টি, জায়গা দখলের ৯১টি, অগ্নিকাণ্ডের ৫০টি, সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ৫০টি, জরুরি অগ্নিসেবার ৪৭টি, নারী সহিংসতার ৩৮টি, পারিবারিক সমস্যার ৩৫টি, মেডিকেল সেবার ৩৪টি এবং চুরির ঘটনায় ২২টি কল করা হয়।

জুন মাসে ৬৮১ কল— জুন মাসে মারামারি ১৬৬টি, জায়গা দখলের ৯৮টি, দুর্ঘটনার ৮০টি, জরুরি অগ্নিসেবার ৬৫টি, সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ৫৬টি, নারী সহিংসতার ৪৮টি, পারিবারিক সমস্যার ৩৯টি, মেডিকেল সেবার ৩০টি এবং চুরির ঘটনায় ২০টি কল করা হয়।

জুলাই মাসে ৬৭৮ কল— জুলাই মাসে মারামারি ১৮৮টি, জায়গা দখলের ৮৭টি, দুর্ঘটনার ৭৬টি, অগ্নিকাণ্ডের ৬৯টি, সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ৬৫টি, জরুরি অগ্নিসেবার ৫৭টি, নারী সহিংসতার ৫১টি, পারিবারিক সমস্যার ৩৭টি, মেডিকেল সেবার ২৬টি এবং চুরির ঘটনায় ২২টি কল করা হয়।

আগস্ট মাসে ৭১২ কল— আগস্ট মাসে মারামারি ১৭৪টি, জায়গা দখলের ১০২টি, দুর্ঘটনার ১০১টি, সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ৭৩টি, অগ্নিকাণ্ডের ৬৫টি, জরুরি অগ্নিসেবার ৬০টি, নারী সহিংসতার ৪৭টি, পারিবারিক সমস্যার ৩৯টি, মেডিকেল সেবার ৩০টি এবং আটকে রাখার ঘটনায় ২১টি কল দেওয়া হয়েছে।

সেপ্টেম্বর মাসে ৬২৬ কল— সেপ্টেম্বর মাসে মারামারি ১২৪টি, জায়গা দখলের ১০৮টি, দুর্ঘটনার ৮৪টি, অগ্নিকাণ্ডের ৭০টি, সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ৫৯টি, জরুরি অগ্নিসেবার ৫৩টি, নারী সহিংসতার ৪০টি, পারিবারিক সমস্যার ৩৫টি, মেডিকেল সেবার ২৫টি এবং চুরির ঘটনায় ২৪টি কল দেওয়া হয়েছে।

৯৯৯-এর ফোকাল পারসন (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) পুলিশ পরিদর্শক আনোয়ার সাত্তার বলেন, ‘কেউ কোনো না কোনোভাবে বিপদে পরেন। অনেকে ছিনতাই, চুরি-ডাকাতিসহ নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হন। তাই এ সমস্যার সমাধান পেতে দেশের নাগরিকরা এখন ৯৯৯ এ কল কেরে সেবা চান। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ কন্ট্রোল রুম থেকে সেই সেবা গ্রহীতাদের সর্বোচ্চ সেবাটুকু দেওয়া হয়। যারা প্রতিকার চেয়ে কল করে তাদের ঘটনাটি দ্রুত সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশকে অবহিত করা হয়। থানা থেকে ঘটনাস্থলে পুলিশ যায়। তারাই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়।’

‘প্রাণনাশের আশঙ্কা, ধর্ষণ, নির্যাতন, আটকে রাখা, অসুস্থতা, ছিনতাই, দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, অ্যাম্বুলেন্স, পারিবারিক সমস্যা সমাধান, নিখোঁজ শিশু উদ্ধার এবং শব্দদূষণসহ নানা ধরনের সমস্যায় সাধারণ ও বিপদগ্রস্ত মানুষকে কন্ট্রোল রুম থেকে সহযোগিতা করা হচ্ছে’— যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘৯৯৯ নাগরিকের জরুরি যেকোনো প্রয়োজনে কোনো একটি মুঠোফোন থেকে বিনা পয়সায় অ্যাম্বুলেন্স সেবা, পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের ঘটনায় যেকোনো কেউ কল দিতে পারছে। সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে এই সেবা। ৯৯৯ সার্ভিসের প্রশিক্ষিত কর্মীরা প্রয়োজন অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ বা অ্যাম্বুলেন্স সেবা প্রদানকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন।’

২০১৭ সালে ১২ ডিসেম্বর মাসে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর (৯৯৯) এ সেবা চালু করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সেবা চালু হওয়ার পর থেকে সারাদেশ থেকে এখন পর্যন্ত ৪ কোটি ৪ লাখ ২১ হাজার ৪৩৫টি ফোন এসেছে। এর মধ্যে ৫৯ দশমিক ২৫ শতাংশ বা ২ কোটি ৩৯ লাখ ৪৯ হাজার ২৮৪টি কলে কোনো সেবা দেওয়া হয়নি। কোনো কারণ ছাড়াই এসব কল করা হয়েছিল যা ফেক কল হিসেবে ধরা হয়েছে। এছাড়া সেবা দেওয়া হয়েছে ৪০ দশমিক ৭৫ শতাংশ বা ১ কোটি ৬৪ লাখ ৭২ হাজার ১৫১টি কলের বিপরীতে।’

এদিকে জাতীয় জরুরি সেবার (৯৯৯) কলের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় জানিয়েছেন সিএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (পিআর) পংকজ দত্ত। তিনি বলেন, ‘এ সেবাটি মানুষের আস্থার জায়গাটা করে নিয়েছে। মানুষ প্রশংসা করছে। সময় স্বল্পতায় মানুষ এখন ৯৯৯-এ কল দেয়। কারণ অন্য কোথাও কল না দিয়ে ৯৯৯-এ কল দিলেই দ্রুত প্রতিকার চাওয়া যাচ্ছে। আর তাদের ঘটনাটি দ্রুত সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশকে অবহিত করলে থানা থেকে ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার ধরণ বুঝে জাতীয় জরুরি সেবার কন্ট্রোল রুম থেকে অবহিত করা থানায় আবার কল করে বিষয়টি তদারকি করা হয়। যারা প্রতিকার চেয়ে কল করেছেন তারা সঠিকভাবে সেই সহয়তা পেয়েছেন কিনা।’