শিরোনাম :


বিষয় :

ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না কক্সবাজার এলএ শাখায়


১০ জুলাই, ২০২৪ ৮:৫১ : অপরাহ্ণ

আবারও বেপরোয়া সার্ভেয়ার বাকের ও হাসান সিন্ডিকেট

আব্দুল আলীম নোবেল
দফায় দফায় কক্সবাজার ভূমি অধিকগ্রহণ শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা ঘুষের নগদ টাকাসহ গ্রেফতার হলেও থামছে না ঘুষ বাণিজ্য। ঘুষ ছাড়া যেনো কোন ফাইলই নড়ে না কক্সবাজার ভূমি অধিকগ্রহণ শাখায়।ভূক্তভোগীদের অভিযোগ, এল এ শাখার অফিসের ভিতরে ও বাইরে রয়েছে একাধিক দালাল চক্র। এসব দালাল চক্রের মাধ্যমে ঘুষ না দিলে কোন কাজই করেন না এলএ শাখার সার্ভেয়ার ও অন্যান্য কর্মকর্তারা।
যদিও কক্সবাজার ভূমি অধিকগ্রহণ শাখার দেয়ালে বিভিন্ন লিখা রয়েছে ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদানের জন্য কেউ কোনো ঘুষ, কমিশন বা বকশিশ দাবী করলে সাথে সাথে এলও-১, এলও-২, এলও-৩, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও জেলা প্রশাসকের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
তবে ভূক্তভোগীদের অভিযোগ তার উল্টো। তাদের দাবী দেয়ালের ফেস্টুনে এসব নীতিকথা ও অভিযোগর কথা লিখা থাকলেও ফোন রিসিভ করেন না কেউ। এমনকি অফিসে উক্ত কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করা যেনো সোনার হরিণ। দিনের পর দিন বসে থেকেও মিলে না কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎ।
ঘুষ ছাড়া এলএ ফাইল ধরে না কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় কর্মরত সার্ভেয়ার বাকেরুল ইসলাম ও হাসান সিন্ডিকেট। তাদের সহযোগি হিসেবে কাজ করছেন উমেদার মহিউদ্দিন ও চিহ্নিত দালাল মিজান, রিয়াজ, বশর ও আব্বাসসহ একটি শক্তিশালী চক্র । তারা দীর্ঘদিন ধরে ভূক্তভোগিদের জিম্মি করে রেখেছেন বলে দাবী ভূক্তভোগিদের।
সূত্র জানিয়েছে, ফাইলের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র গোপন করে নানান অজুহাতে ২৫ থেকে ৩০ ভাগ কমিশনের দাবীতে অনড় থাকেন এ সিন্ডিকেটটি। যদি দরদাম ঠিক হলে চিহ্নিত ওই দালালদের কাছে টাকা জমা দিতে বলে এ ২ সার্ভেয়ার। তারপর শুরু হয় ফাইলের গতি। তাদের সিন্ডিকেটের অন্যতম সহযোগিতা মহিউদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে এলও অফিসে কাজ করছেন। তিনি ভূমি অধিগ্রহণ শাখার গুরুত্বপূর্ণ গোপনীয় কাগজপত্র দালালদের কাছে সরবরাহ করেন। এতে তিনি মোটা অংকের ঘুষ গ্রহণ করেন। আর বাহিরের লেনদেনের জন্য অপেক্ষামান থাকেন দালাল আব্বাস। এ ধরণের অহরহ ঘটনা ঘটছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায়।
সূত্র আরও জানিয়েছে, ইতোপূর্বে শাহীন নামের এক সার্ভেয়ার ভূমি অধিগ্রহণ শাখার গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ক্ষতিগ্রস্তদের ডকুমেন্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বাইরে গোপন স্থানে সরিয়ে ফেলার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হয়। ওই সময় তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে তিনি আবারও এই শাখায় যোগদান করেছেন বলে জানাগেছে।
একইভাবে কাইয়ুম নামে এক সার্ভেয়ার নানা অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে শাস্তিমূলক বদলী হয়। তিনি সম্প্রতি আবারও যোগদান করেছেন। এছাড়া বাকেরুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন পুরাতন সার্ভেয়ার নতুন করে এই শাখায় যোগদান করে দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কমিশন ও ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

বর্তমান অবস্থায় কমিশন ও ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না। ফাইলের কাজ শুরুর আগে কমিশন ও ঘুষের অংক নির্ধারণ করতে হয়। পুরাতন সার্ভেয়ারদের স্বমূর্তি ধারনের কারনে হয়রানির শিকার হচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকরা। নতুন পুরাতন মিলে সার্ভেয়াররা দালাল ছাড়া কোনো কাজই করছেন না। এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ পাওয়া স্বপ্নের মতো। মাসের পর মাস জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা যাওয়া-আসা করলেও ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মেলেনা ক্ষতিপূরণের টাকা। কিন্তু দালালদের মাধ্যমে কাজ করলে খুব কম সময়ে অধিগ্রহনের টাকা উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে।
কক্সবাজার ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় কর্মরত সার্ভেয়ার হাসান ও বাকের এর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তারা ভূমি মালিকের কাছ থেকে ফাইল পাস করানোর জন্য ২৫ থেকে ৩০% করে ঘুষ দাবি করে আসছে। আগে ভূমি মালিকরা তাদেরকে ২০% করে ঘুষ দিলে ফাইল পাস করে দিতো। সার্ভেয়ার হাসান ও বাকের ৩০% এর কম হলে ভূমি মালিকদের সাথে দুর্ব্যবহার করে। পাশাপাশি তাদের ফাইল পাস করানোর নামে মাসের পর মাস সময় দিতে থাকে। নয়তো তাদের নির্দিষ্ট কয়েকজন দালাল রয়েছে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে বলে।নাম প্রকাশ না করার শতে জমির মালিকরা আরও জানান সার্ভেয়ার হাসান ও বাকের খুব বেপরোয়া আচরণ করে।
সার্ভেয়ার হাসান থেকে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কিছুই না বলে চেয়ার থেকে উঠে চলে যায়। তিনি খুব রাগান্বিতভাবে বলে এসব আমি জানিনা। আমার উপরের সিনিয়রদের কাছ থেকে জেনে নিন। তিনি আরও বলেন, যদি জানতে চান তাহলে ডিসি স্যার এবং এডিসি রেভিনিউ স্যার থেকে জেনে নিন। অপারদিকে এসব বিষয় জানতে সার্ভেয়ার বাকেরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য দেওয়া সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলএ শাখায় কাজ করা অনেকে বলেন, বাকেরুল ইসলাম বাহাদুরকে কক্সবাজারে আনার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন কক্সবাজার এলএ শাখা কেন্দ্রিক আলোচিত দুদকের তালিকাভুক্ত দালাল চক্রের সদস্যরা। এসব দালাল বহিষ্কৃত দুদক কর্মকর্তা মো: শরিফের হয়ে কক্সবাজারে কাজ করতেন। শুধু বাকেরুল নয়, কক্সবাজার এলএ শাখায় কর্মরত সার্ভেররা ক্ষতিগ্রস্তদের সাথে এমন আচরণ করেন যাতে বাধ্য হয়ে দালালের শরণাপন্ন হতে হয়। এমনকি কোন দালালের কাছে যাবেন সে দালালের নামও বলে দেন সার্ভেয়ার সিন্ডিকেট।
এ বিষয়ে কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের মুখপাত্র এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজারে মেগা প্রকল্প চালু হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে আলোচনায় যে প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে সেটি হচ্ছে এলও অফিস। এই এলও অফিসকে ঘিরে দুদকের অনেক অভিযান হয়েছে এবং অনেক সার্ভেয়ার আইনের আওতায় এসেছে। অনেকেই দুদকের মামলায় অভিযুক্ত হয়েছে, তারপরেও তাদের দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না এবং কমিশন বাণিজ্য বন্ধ হচ্ছে না।
এই ব্যর্থতার জন্য ডিসি অফিসসহ দায়িত্বশীল সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দায়ী, অভিযুক্ত যারা তাদের দ্রুত শাস্তির আওতায় যদি আনা যায় তাহলে এলও অফিসের যে দুর্নীতি সেটি লাগাম টেনে ধরা যাবে বলে তিনি মনে করছেন। কক্সবাজারের সর্বমহল চায় এই কমিশন বাণিজ্য বন্ধ হোক এবং জড়িতেদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান জানান, ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদানের জন্য কেউ কোন ঘুষ, কমিশন বা বকশিশ দাবী করলে সাথে সাথে এলও, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) অথবা তার (ডিসি’র) সাথে যোগাযোগ করার জন্য বলেছেন।
তাছাড়া দ্রুত সেবা ও হয়রানী থেকে বাঁচতে এলএ শাখার সামনে বুথ দেয়া হয়েছে। গ্রাহক চাইলে বুথে বসে কর্মকর্তাদের সাথে সরাসরি কথা বলতে পারবে। তারপরেও যদি সমাধান না হয় জেলা প্রশাসকের দরজা সব সময় খোলা। যেকোন সময় চাইলে আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন।
তিনি আরও জানান, মামলা চলমান বা নিষেধাজ্ঞা থাকার পরেও ক্ষতিপূরণের চেক প্রদানের ব্যাপারে আমার জানা নেই। ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কোন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যদি কমিশন বাণিজ্য বা কোন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায় তাহলে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরো সংবাদ