শিরোনাম :


বিষয় :

গার্ডেন মার্কেট লিমিটেডের শেয়ার জালিয়াতী প্রমাণে একযুগ, ব্যর্থ সিআইডি, সফল পিবিআই


৬ জুলাই, ২০২৪ ৪:৪২ : অপরাহ্ণ

বিশেষ প্রতিবেদক:
ঢাকার পশ্চিম কাওরান বাজারস্থিত ২০/২১ নং গার্ডেন রোডে “গার্ডেন মার্কেট লিমিটেড” নামীয় একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৪ সনে। তৎসময়ে কাওরান বাজারের উচ্ছেদকৃত গরীব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমন্বয়ে এই কোম্পানি গঠিত ও নিবন্ধিত হয়। উদ্যোক্তা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন তখনকার উদ্যমী যুবক- ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো: মোবারক উল্যা। কোম্পানিটির নিবন্ধন নং সি- ৪৪২৪/৮৩ অব ১৯৭৪-৭৫, তারিখ: ৩০.১০.১৯৭৪ খ্রি:। প্রাথমিক স্তরের প্রতিশ্রুত বা অংশীদার সদস্য ৪০ জন। ক্রয়কৃত মোট শেয়ার সংখ্যা: ২৪৫০টি। প্রতি শেয়ারের মূল্য ১০০/= টাকা। মোট পরিশোধিত মূল্য ২,৪৫,০০০/= টাকা। পরবর্তীতে ২য় স্তরে শেয়ার ক্রয়প্রার্থী আরও ৪৬ জন সংযুক্ত হয়; যাহারা অনুমোদন প্রাপ্তির অপেক্ষায় ছিল।
অংশীদার সদস্যদের ব্যবসায় পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১৯৭৪-১৯৭৭ সময়কালে উক্ত ২০/২১ নং হোল্ডিংয়ের ১২ কাঠা জমি কোম্পানির নামে ক্রয় করা হয়। কবলা দলিল নং যথাক্রমে ৪৬১৯/৭৪, ২২২/৭৫ এবং ২৪৯৯৩/৭৭। কোম্পানির কার্যক্রম ঠিকঠাক চলছিল। ইত্যবকাশে প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: মোবারক উল্যা সরকারী চাকরির সুবাদে ০৭.০৪.১৯৭৮ খ্রি: তারিখে বাংলাদেশ রেলওয়েতে যোগদান করেন। তাহার অনুপস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করে স্থানীয় ভূমি দস্যু তৎসময়ের ওয়ার্ড কমিশনার আবদুস সাত্তার খান অপরাপর শঠ ও লোভী ব্যক্তির সক্রিয় সহযোগিতায় ও অংশগ্রহণে কোম্পানির ভোগদখলীয় উক্ত সম্পত্তি তাহারা জবর দখল করে এবং কূটকৌশলে কোম্পানির অফিস, স্থাপনা, যাবতীয় দলিলপত্র, নথিপত্র, আসবাবপত্র, কাগজপত্র প্রভৃতি দখল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যায়। পর্যায়ক্রমে চরম শঠতা ও জাল-জালিয়াতির আশ্রয় গ্রহণ করে অধিকাংশ স্পন্সর সদস্যের শেয়ার আত্মসাৎ করে। তাহারা বিভিন্ন তঞ্চক কাগজপত্র সৃজন করে এবং কোম্পানির সকল রেকর্ডপত্র গোপন/পরিবর্তন করে কোম্পানি ও কোম্পানির সম্পত্তির মালিকরুপে আবির্ভূত হয়।
সরকারি চাকরি হতে অবসর গ্রহণ করার পর উদ্যোক্তা ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: মোবারক উল্যা বিষয়টি জ্ঞাত হয়। তিনি নিজ প্রচেষ্টায় বিভিন্ন সোর্স হতে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র সংগ্রহ করে এবং জড়িত অপরাধীদের নাম উদ্ধারে সক্ষম হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে আরজেএসসি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পুলিশ কর্তৃপক্ষ, পূর্তমন্ত্রণালয়, রাজউক প্রভৃতি কর্তৃপক্ষের নিকট প্রতিকার প্রার্থনা করে অভিযোগ করে। তাতে কোনো প্রতিকারের আশা না দেখে তিনি ঢাকার বিজ্ঞ সিএমএম আদালতে বিগত ০৩.০৬.২০১২ খ্রি. তারিখে ৫০৮/১২ নং সিআর মামলা দায়ের করে। ধারাঃ ৪২০/৪০৬/৪৬৫/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/৫০৬ বি.পি.সি।
মামলার আসামী- (১) মো: আবদুস সাত্তার খান, (২) মো: আবুল হোসেন হাসান, (৩) রাগীব হোসেন খাঁন (বর্তমানে মৃত), (৪) মোহাম্মদ আলী, (৫) মো. মমিন উল্যা (বর্তমানে মৃত), (৬) নূর জাহান বেগম, (৭) মো: সেলিম, (৮) হারুন অর রশিদ, (৯) এস.কে. শিকদার, (১০) মো: শওকত হোসেন (বর্তমানে মৃত), (১১) মো: তোফাজ্জল হোসেন, (১২) কাজী মনিরুন্নেছা হাছান, (১৩) মাকসুদুল মজিদ সোহেল, (১৪) মো: সিরাজুল ইসলাম, (১৫) সমিরেন্দ্র চন্দ্র বর্ধন, (১৬) দিপা রানী সাহা, (১৭) মো: আবু তাহের, (১৮) মেরিনা আফরোজ, (১৯) শাহীনুর বেগম, (২০) মো: আবুল কাশেম (ঠিকানা অজ্ঞাত), (২১) মো: হাসানুজ্জামান, (২২) সৈয়দ আহমেদ, (২৩) মো: শরাফত আলী (বর্তমানে মৃত), (২৪) মাওলানা মো: সাঈদ (বর্তমানে মৃত), (২৫) মুজিবল হক, (২৬) মো: সিরাজুল ইসলাম, (২৭) শামসুন নাহার, (২৮) সুপ্রিয় বর্ধন, (২৯) মো: মোস্তফা, (৩০) এ.এন. ঘরামী, (৩১) এম.জি. সরওয়ার মানিক, (৩২) মো: ওয়াহিদুজ্জামান।
বিজ্ঞ সিএমএম আদালতের ১০.০৬.২০১২ খ্রি: তারিখের নির্দেশে সিআইডি কর্তৃক তদন্ত বা অনুসন্ধান পরিচালিত হয়। বাদী কর্তৃক ৩১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য, জাল-জালিয়াতীর দৃশ্যত: প্রমাণপত্র উপস্থাপন করা হলেও সিআইডি’র দীর্ঘ সময়ের তদন্তে তদন্ত কর্মকর্তার নিকট (পুলিশ পরিদর্শক মো: মুক্তার হোসেন, সহকারী পুলিশ সুপার মো: রুহুল আমিন) আসামীদের সংঘটিত অপরাধ প্রমাণিত হয়নি। ফলকথা, সিআইডি বিজ্ঞ আদালতে ০৩.০৯.২০১৩ খ্রি: তারিখে চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করে। এতে বাদী সংক্ষুব্ধ হয়ে বিজ্ঞ আদালতে নারাজী দাখিল করলে শুনানী অন্তে তাহা খারিজ হয়। উহার বিরুদ্ধে বিজ্ঞ মহানগর দায়রা জজ আদালতে বাদী ৮৬/২০১৪ নং ফৌজদারী রিভিউ দায়ের করে। শুনানী অন্তে তাহাও খারিজ হয়।
উক্ত খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে মহামান্য হাইকোর্টে বাদী ৩৩৯২৪/১৫ নং বিবিধ মামলা দায়ের কললে শুনানী অন্তে বাদীর পক্ষে রায় ঘোষণা হয়। অতঃপর আসামীপক্ষে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে সিপিএলএ নং ১৭১৬/১৯ দায়ের হলে তাহা শুনানী অন্তে খারিজ হয়। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে মহামান্য হাইকোর্টের ১৫.০১.২০১৮ খ্রি: তারিখের রায় অতঃপর ২৮.০৮.২০১৯ খ্রি: তারিখের সংশোধনী রায় বলে এবং বিশেষ করে সিপিএল ১৭১৬/১৯ মামলা মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের ফুল বেঞ্চের ০২.০৬.২০২১ খ্রি: তারিখের সুবিদিত খারিজাদেশের পর উক্ত ৫০৮/১২ নং সিআর মামলাটি বাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ সিএমএম আদালতে নথি পুনঃগঠন করে পুনরুজ্জীবিত করা হয় এবং শুনানী অন্তে বিজ্ঞ সিএমএম আদালত ঘটনার পুনঃ তদন্তের জন্য ২২.১২.২০২২ খ্রি: তারিখে পিবিআই-কে নির্দেশ প্রদান করেন।
পিবিআই কর্তৃক পরিচালিত আদ্যেপান্ত তদন্তে এবং সাক্ষ্য প্রমাণে আসামীদের বিরুদ্ধে আনীত বাদীর অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত হয়। অথচ সিআইডি তাহা উপলব্ধিতে তথা উদঘাটনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। ইতোমধ্যে একযুগ সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। তাহাতে বাদী এবং অন্যান্য শেয়ার হোল্ডাররা বিভিন্নভাবে অপূরণীয় ক্ষতির সন্মুখীন হয়েছেন। এ পর্যায়ে পিবিআই কর্তৃক দাখিলকৃত ০৩.০৭.২০২৩ ইং তারিখের প্রতিবেদন এবং ২২-০৪-২৪ ইং তারিখের সম্পূরক প্রতিবেদনের মতামত অনুযায়ী বিজ্ঞ আদালত জীবিত ২৬ জন আসামীর বিরুদ্ধে ২-০৬-২০২৪ খ্রি: তারিখের ১৩ নং আদেশ দ্বারা পেনাল কোডের ৪২০/৪০৬/৪৬৫/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/৫০৬ ধারার অপরাধ আমলে নিয়ে সমন ইস্যুর নির্দেশ দেন এবং ২৪/০৭/২০২৪ ইং তারিখ সমন তামিলের জন্য দিন ধার্য রাখেন।
অপরাধ প্রমাণিত হলেও মৃত্যুর কারণে ৫ জন ও ঠিকানা না থাকার কারণে ১ জন আসামীকে মামলা হতে অব্যাহতি দান করেন। উল্লেখ্য, আলোচ্য কোম্পানীর শেয়ার কেলেঙ্কারীর বিষয়ে বাদী কর্তৃক আনীত মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে কোম্পানী মেটার নং ২৬৪/২০২২ বিচারাধীন আছে। বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের নিকট পেশকৃত বাদীর বিভিন্ন অভিযোগের উপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করার কারণে এমনকি বিজ্ঞ আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায়ও আসামীরা প্রশাসন ও পুলিশের নাকের ডগায় কোম্পানীর সম্পত্তিতে অবৈধ বহুতল ভবন নির্মাণ করে যাচ্ছে। প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা কাহারও নেই। এ অবস্থায় আলোচ্য কোম্পানীর ক্ষতিগ্রস্ত শেয়ার হোল্ডারদের অপূরণীয় ক্ষতির জন্য জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা দায় এড়াতে পারেন না। তাদেরও দায়-দায়িত্ব চিহ্নিত হওয়া এবং চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা ক্ষতিগ্রস্ত শেয়ার হোল্ডারদের দাবী।

আরো সংবাদ